পেলের পায়ের জাদুতে মিশেছিল শক্তি, গতি, বুদ্ধি এবং সৌন্দর্যের শিল্প

দেবদাস সিংহ
ফুটবলকে শুধু গোলের খেলা হিসেবে দেখলে পেলের প্রতি অবিচার করা হয়। ফুটবল হতে পারে একই সঙ্গে শক্তির, গতির, বুদ্ধির এবং সৌন্দর্যের শিল্প। পেলে হলেন সেই শিল্পেরই এক পূর্ণাঙ্গ রূপ। তাঁর পায়ে বল এলে মনে হতো, মাঠের ঘাসের উপর দিয়ে কোনও খেলোয়াড় ছুটছেন না, ছুটে চলেছে এক আশ্চর্য কল্পনা। আর সেই কল্পনার ভিতরে মিশে আছে অবিশ্বাস্য শক্তি, শরীরের ভারসাম্য, নিখুঁত সময়জ্ঞান এবং চোখ ধাঁধানো দক্ষতা।
আজ ২৩ অক্টোবর তাঁর জন্মদিন। আজকের প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়েই পেলের খেলা সরাসরি দেখেনি। ইউটিউবের কিছু পুরনো ফুটেজ, সাদা-কালো ছবি কিংবা কয়েকটি বিখ্যাত গোলের দৃশ্য দেখে তাঁকে চেনার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কয়েক মিনিটের কিছু ভিডিও দেখে কি পেলের মতো একজন ফুটবলারকে সত্যিই বোঝা যায়? কোনও একটি গোল, কোনও একটি ড্রিবল, কোনও একটি ফাইনালের স্মৃতি কি একজন খেলোয়াড়ের সম্পূর্ণতা তুলে ধরতে পারে?
পেলের আসল নাম এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। ১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর ব্রাজিলের ত্রেস কোরাসোয়েসে তাঁর জন্ম। বাবা ডনদিনহো ছিলেন ফুটবলার। কিন্তু ফুটবল খেলে সংসার চালানো সহজ ছিল না। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা ছেলেটির কাছে ফুটবল ছিল একই সঙ্গে আনন্দ, স্বপ্ন এবং দারিদ্র্যকে অতিক্রম করার পথ। শৈশবে কাপড়ের টুকরো দিয়ে তৈরি বল নিয়ে খেলতেন তিনি। সেই ছেলেই একদিন হয়ে উঠবেন বিশ্বফুটবলের রাজা।
পেলের জীবনের সঙ্গে ফুটবলের ইতিহাসের একটি আবেগময় মুহূর্ত জড়িয়ে আছে। ১৯৫০ সালে মারাকানায় উরুগুয়ের কাছে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ হারার পর বাবাকে কাঁদতে দেখেছিলেন ছোট্ট পেলে। মাত্র ন’ বছর বয়সে বাবাকে কথা দিয়েছিলেন, একদিন তিনি ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতাবেন। আট বছর পরে, ১৯৫৮ সালে, সুইডেনে সেই প্রতিশ্রুতি সত্যি হয়। সতেরো বছরের পেলে বিশ্বকাপ ফাইনালে জোড়া গোল করে ব্রাজিলকে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন।
এই গল্পে রূপকথা আছে। কিন্তু পেলের সাফল্যকে শুধু রূপকথা বলে ব্যাখ্যা করলে তাঁর পরিশ্রম, প্রতিভা এবং মানসিক দৃঢ়তাকে ছোট করা হয়। কিশোর বয়সেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, প্রতিভা শুধু বয়সের অপেক্ষা করে না। প্রতিভা নিজের জন্য জায়গা তৈরি করে নেয়।
শক্তি ও সৌন্দর্যের বিরল মিশ্রণ
পেলেকে নিয়ে কথা বলতে গেলে একটা কথা বারবার ফিরে আসে— তাঁর খেলার মধ্যে ছিল শক্তি ও সৌন্দর্যের বিরল মিশ্রণ।
তাঁর শরীরী শক্তি ছিল। দ্রুত দৌড়, ক্ষিপ্রতা, প্রতিপক্ষের বাধা সামলে বল নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, শটের মধ্যে অসাধারণ জোর। সবই ছিল তাঁর অস্ত্র। কিন্তু পেলের ফুটবলকে শুধু শারীরিক ক্ষমতার প্রদর্শনী বলা যায় না। কারণ তিনি জানতেন, কখন গতি বাড়াতে হয়, কখন বলের গতি কমাতে হয়, কখন নিজে গোলের দিকে এগিয়ে যেতে হয়, আর কখন সতীর্থকে দিয়ে গোল করাতে হয়।
তাঁর বিখ্যাত বাইসাইকেল কিক থেকে শুরু করে ড্রিবলিং, হেডার, দূরপাল্লার শট— কোনও একটি বিশেষ কৌশলের মধ্যে তাঁকে আটকে রাখা যায় না। ফুটবলকে যখন বলা হয় দ্য বিউটিফুল গেম, তখন সেই সৌন্দর্যের ধারণার সঙ্গে পেলের নাম অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে। ফুটবলের নান্দনিকতাকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলার অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন তিনি।
তিনটি বিশ্বকাপ, এক অনন্য ইতিহাস
পেলে সংক্রান্ত আলোচনায় পরিসংখ্যানকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ব্রাজিলের হয়ে তিনি ১৯৫৮, ১৯৬২ এবং ১৯৭০ সালে তিনটি বিশ্বকাপ জিতেছেন। পুরুষদের ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি তিনবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য হয়েছেন।
১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের ব্রাজিল দলকে অনেকেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল বলে মনে করেন। সেই দলে ছিলেন জিয়ারজিনো, টোস্টাও, রিভেলিনো, কার্লোস আলবার্তোদের মতো ফুটবলার। এমন তারকাখচিত দলের মধ্যেও পেলে ছিলেন কেন্দ্রীয় আকর্ষণ। ইতালির বিরুদ্ধে ফাইনালে তাঁর গোল এবং কার্লোস আলবার্তোর সেই বিখ্যাত দলগত গোল আজও ফুটবলের নান্দনিকতার আলোচনায় ফিরে আসে।
তবে শুধু বিশ্বকাপ জয়ের সংখ্যায় পেলের শ্রেষ্ঠত্ব মাপা সম্ভব নয়। বিশ্বকাপের বাইরেও স্যান্টোসের হয়ে তাঁর দীর্ঘ কেরিয়ার, ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য সাফল্য এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে তাঁর ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পেলের জীবন ছিল ব্রাজিলের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে বিশ্বখ্যাত হওয়া, দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠা, বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের পরিচিতিকে নতুন মাত্রা দেওয়া— এসব তাঁর পরিচয়ের অংশ। তাঁর বাবা ছিলেন এক ব্যর্থতার বেদনা বয়ে বেড়ানো ফুটবলার। সেই বাবার চোখের জল মুছে দেওয়ার স্বপ্ন থেকেই ছেলের বিশ্বজয়ের সংকল্পের জন্ম।
পরে পেলে নিজেও খ্যাতি, অর্থ, রাজনৈতিক চাপ এবং জনজীবনের নানা জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর জীবন নিয়ে বিতর্কও আছে। কোনও কিংবদন্তিকে বিচার করার সময় সেই বিতর্ককে অস্বীকার করা উচিত নয়। কিন্তু তাঁর ফুটবল-প্রতিভা এবং মানুষের কল্পনায় তাঁর প্রভাবকে আলাদা করে দেখারও প্রয়োজন আছে।
১৯৭৫ সালে নিউ ইয়র্ক কসমসে যোগ দিয়ে পেলে আমেরিকায় ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ইউরোপীয় ফুটবলের বাইরে একটি দেশে ফুটবলকে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে তিনি ছিলেন অন্যতম পরিচিত মুখ। ১৯৭৭ সালে খেলোয়াড়জীবন শেষ করার পরও ফুটবলের দূত হিসেবে তাঁর পরিচিতি অটুট ছিল।
মানুষ পেলের এই পরিচয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ফুটবল মাঠের বাইরেও তিনি এমন এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন, যাঁর নাম ভাষা, দেশ এবং সংস্কৃতির সীমা পেরিয়ে পরিচিতি পেয়েছিল।
পেলে বনাম মেসি
আজকের ফুটবল অনেক বদলে গিয়েছে। খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণের বিজ্ঞান, ডেটা বিশ্লেষণ, ভিডিও প্রযুক্তি, কৌশলগত প্রস্তুতি— সব ক্ষেত্রেই বিপুল পরিবর্তন এসেছে। মেসি, রোনাল্ডো, এমবাপে কিংবা আধুনিক প্রজন্মের অন্য তারকাদের খেলা সরাসরি দেখার সুযোগ আজকের দর্শকদের আছে। তাঁদের প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি গোল, প্রতিটি মুভ মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়।
পেলের সময়ে সেই সুযোগ ছিল না। তাঁর বহু ম্যাচের সম্পূর্ণ ভিডিও আজ সহজলভ্য নয়। পুরনো ফুটেজের গুণমানও আধুনিক সম্প্রচারের মতো নয়। ফলে আজকের দর্শকের পক্ষে পেলের খেলার সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা পাওয়া কঠিন। সেইসঙ্গে তাঁর প্রতিভার যোগ্য বিচার করাও সহজ নয়। আজকের গ্ল্যামার, প্রচার তিনি পাননি। সেইক্ষেত্রে পেলে অনেকটাই পিছিয়ে আছেন।
আরও একটি সমস্যা আছে। বিভিন্ন যুগের ফুটবলারদের তুলনা করার জন্য কোনও নির্ভুল যন্ত্র নেই। পেলে যদি আজ খেলতেন, তাঁর পারফরম্যান্স কেমন হতো? মেসি যদি পেলের সময়ে খেলতেন, কতটা সাফল্য পেতেন? এই প্রশ্নগুলির কোনও নিশ্চিত উত্তর নেই। কারণ খেলোয়াড়দের গড়ে তোলে তাঁদের সময়, প্রশিক্ষণ, সতীর্থ, প্রতিপক্ষ এবং খেলার পরিবেশ।
তাই পেলে সর্বকালের সেরা কি না, সেই বিতর্কের চূড়ান্ত মীমাংসা হয়তো কোনও দিনই হবে না। কিন্তু তাঁকে বুঝতে হলে আজকের ফুটবলের মাপকাঠি দিয়ে তাঁর সময়কে বিচার করলেই চলবে না। দেখতে হবে, তিনি তাঁর সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে কতটা অসাধারণ ছিলেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের ফুটবল-ভাবনাকে কতটা প্রভাবিত করেছিলেন।
এখানেই পেলের বিশেষত্ব। তিনি এমন এক সময়ে ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিলেন, যখন আজকের মতো সর্বব্যাপী টেলিভিশন সম্প্রচার কিংবা ডিজিটাল মাধ্যম ছিল না। তবু তাঁর নাম পৃথিবীর প্রতিটি ফুটবলপ্রেমী দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল।
পেলে আসলে একটি অনুভূতির নাম
তাঁর খেলা আজকের প্রজন্ম সরাসরি দেখেনি বলে তাঁকে বোঝা অসম্ভব নয়। কিন্তু তাঁকে বুঝতে হলে কয়েকটি ভাইরাল ভিডিওর বাইরে যেতে হবে। ইতিহাস জানতে হবে, তাঁর সময়ের ফুটবল দেখতে হবে, তাঁর সতীর্থ ও প্রতিপক্ষদের বুঝতে হবে। তাহলেই বোঝা যাবে, কেন একটি নাম কয়েক দশক পেরিয়েও ফুটবলের আলোচনায় ফিরে আসে।
২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর পেলে পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর ফুটবল থেকে গিয়েছে। তাঁর গোল থেকে গিয়েছে। তাঁর হাসিমুখ, তাঁর হলুদ জার্সি, তাঁর উঁচু করে তোলা হাত— সবই থেকে গিয়েছে ফুটবলের সম্মিলিত স্মৃতিতে।
