অলিম্পিকের পুরনো ঠিকানায় নতুন স্বপ্নের হাতছানি

শুভ্রাংশু মুখোপাধ্যায়
মিউনিখ
মিউনিখের অলিম্পিয়া পার্কের পাশ দিয়ে কতবার যে হেঁটে গিয়েছি, তার হিসেব নেই। বাড়ি থেকে মাত্র মিনিট দশেকের হাঁটাপথ। গ্রীষ্মের বিকেলে হ্রদের ধারে মানুষের ভিড়, শীতকালে অনেকটা ফাঁকা মাঠ, আর সব ঋতুতেই একই রকম দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিখ্যাত অলিম্পিক স্টেডিয়াম। এতদিন এই জায়গাটাকে মূলত ১৯৭২ সালের অলিম্পিকের স্মৃতি হিসেবেই দেখে এসেছি। কিন্তু সম্প্রতি মিউনিখে আবার অলিম্পিক আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর পরিচিত জায়গাটাকে যেন একটু অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছি।
কারণ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর আবার অলিম্পিক আয়োজনের স্বপ্ন দেখছে মিউনিখ।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর জার্মানির বাডেন–বাডেন শহরে জার্মান অলিম্পিক স্পোর্টস কনফেডারেশন বা DOSB–এর বিশেষ অধিবেশনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০৩৬, ২০৪০ অথবা ২০৪৪ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিক আয়োজনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জার্মানির প্রতিনিধিত্ব করবে মিউনিখ। চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল কোলন–রাইন–রুর অঞ্চল। মোট ১৪১টি ভোটের মধ্যে ৯১টি, অর্থাৎ ৬৪.৯১ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে বাভারিয়ার রাজধানী মিউনিখ।
তবে মিউনিখ এখনও অলিম্পিক আয়োজনের অধিকার পায়নি। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সিদ্ধান্তের ওপরেই নির্ভর করছে শেষ পর্যন্ত কোন শহরের ভাগ্যে জুটবে এই সুযোগ। ২০২৮ সালের অলিম্পিক হবে আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে এবং ২০৩২ সালে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে। তাই মিউনিখের সামনে প্রথম সম্ভাবনা ২০৩৬ সাল।
এই প্রসঙ্গে ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর মিউনিখের বাসিন্দাদের মধ্যে একটি গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে অংশগ্রহণকারী ভোটদাতাদের ৬৬.৪ শতাংশ আবার অলিম্পিক আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। এত বড় আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের আগে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়ার বিষয়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
মিউনিখের এই নতুন অলিম্পিক পরিকল্পনার কথা জানতে গিয়ে আমার মনে পড়ছিল কলকাতায় কাটানো ছোটবেলার দিনগুলোর কথা।আমাদের ছোটবেলায় অলিম্পিকের সঙ্গে প্রথম পরিচয়টা অনেক সময় খেলাধুলার মাঠে নয়, বরং স্কুলের সাধারণ জ্ঞানের বইয়ের পাতায়। কোন সালে কোথায় অলিম্পিক হয়েছিল, কে কতগুলো সোনার পদক জিতেছিলেন, কোন খেলোয়াড় কোন দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, এইসব প্রশ্নের উত্তর মনে রাখতে হতো জেনারেল নলেজ বা জি কে পরীক্ষার জন্য। কার্ল লুইস, পরবর্তীকালে মাইকেল ফেলপ্স, কত নামই না মনে রাখতে হয়েছে! তখন হয়তো তাঁদের প্রত্যেকের খেলা দেখার সুযোগ হতো না, কিন্তু নামগুলো বেশ পরিচিত হয়ে গিয়েছিল।
তারপর ধীরে ধীরে টেলিভিশনের পর্দায় অলিম্পিককে নতুনভাবে চিনতে শুরু করি। ১৯৯৬ সালের আটলান্টা অলিম্পিকের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। সেবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সঙ্গীত রচনায় যুক্ত ছিলেন আমাদের দেশের প্রখ্যাত তবলাবাদক উস্তাদ জাকির হুসেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর এই কাজের কথা জানতে পেরে বেশ ভালো লেগেছিল। অলিম্পিক যে শুধু খেলাধুলার প্রতিযোগিতা নয়, তার সঙ্গে বিশ্বের নানা দেশের সংস্কৃতি, সঙ্গীত এবং শিল্পকলারও একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে, সেটা তখন আরও ভালোভাবে বুঝতে শুরু করি।আর সেই আটলান্টা অলিম্পিকেই ভারতের লিয়েন্ডার পেজ টেনিসে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন। ১৯৫২ সালের পর সেটিই ছিল ভারতের প্রথম ব্যক্তিগত অলিম্পিক পদক। ভারতীয় খেলাধুলার ইতিহাসে সেটি ছিল এক উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত।কার্ল লুইসের একের পর এক সোনার পদক জয়ের গল্প, পরে মাইকেল ফেলপ্সের সাঁতারে অবিশ্বাস্য সাফল্য, লিয়েন্ডার পেজের ব্রোঞ্জ, এসবের মধ্য দিয়েই অলিম্পিক সম্পর্কে আগ্রহটা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। স্কুলের সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে যে নামগুলো পড়তাম, টেলিভিশনে তাঁদের খেলা কিংবা সাফল্যের ছবি দেখার সুযোগ হলে সেই নামগুলো যেন আরও বাস্তব হয়ে উঠত।
কলকাতায় বেড়ে ওঠার সময় অবশ্য ক্রিকেটই ছিল আমাদের খেলাধুলার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। পাড়ার মাঠ থেকে স্কুলের ক্লাসরুম, সর্বত্র ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা। ভারতের কোনও বড় ম্যাচ থাকলে তো কথাই নেই। কিন্তু চার বছর অন্তর অলিম্পিক এলেই হঠাৎ করে সেই চেনা পৃথিবীটা অনেক বড় হয়ে যেত। অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার, জিমন্যাস্টিক্স, বক্সিং, হকি, কত রকমের খেলা! ক্রিকেটের বাইরেও যে খেলাধুলার এত বড় একটা জগৎ রয়েছে, সেটা অলিম্পিকের সময়ই যেন বেশি করে বুঝতে পারতাম।আর সেই অলিম্পিকের ইতিহাস জানতে গিয়েই একসময় ভারতীয় হকির সোনালি যুগের কথা পড়েছিলাম। ধ্যানচাঁদের নাম, একের পর এক অলিম্পিক সোনা, বিশ্ব হকিতে ভারতের আধিপত্য। মজার ব্যাপার হল, সেই ইতিহাসেরই একটা অধ্যায় লেখা হয়েছিল আজকের আমার বাসস্থান মিউনিখের মাটিতে।

মিউনিখের ঐতিহাসিক অলিম্পিয়া পার্ক। ১৯৭২ সালের অলিম্পিকের স্মৃতিবিজড়িত এই চত্বরকে ঘিরেই আবার নতুন অলিম্পিক আয়োজনের স্বপ্ন দেখছে জার্মানি।
১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে ভারত একটিই পদক জিতেছিল। পুরুষদের হকিতে ব্রোঞ্জ। হরমীক সিংয়ের নেতৃত্বে ভারতীয় দলে ছিলেন অজিত পাল সিং, অশোক কুমার, বি পি গোবিন্দ, হরচরণ সিংয়ের মতো খেলোয়াড়রা। সেমিফাইনালে পাকিস্তানের কাছে ২–০ গোলে হারের পর ১০ সেপ্টেম্বর ব্রোঞ্জ পদকের ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে ২–১ গোলে হারিয়েছিল ভারত।অর্থাৎ আমার জন্মেরও অনেক আগে, বাড়ির কাছে যে অলিম্পিয়া পার্কে আজ আমি হাঁটতে যাই, সেই চত্বরেই ভারতীয় হকি দল অলিম্পিকের পদকের জন্য লড়াই করেছিল। বিষয়টা ভাবলে এখনও বেশ অদ্ভুত লাগে।
১৯৭২ সালের অলিম্পিক অবশ্য শুধু খেলার জন্য মনে রাখা হয় না। সেই অলিম্পিকে ঘটেছিল এক ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হামলা। ৫ সেপ্টেম্বর অলিম্পিক ভিলেজে প্যালেস্তিনীয় সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের হামলায় ইজরায়েলি দলের ১১ জন সদস্য এবং একজন পশ্চিম জার্মান পুলিশকর্মী প্রাণ হারান। সেই ঘটনা আজও অলিম্পিক ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।অলিম্পিয়া পার্কে গেলে তাই শুধু একটা পুরনো স্টেডিয়াম বা সুন্দর স্থাপত্য দেখা হয় না। এখানে আনন্দের ইতিহাস যেমন আছে, তেমনই আছে বেদনার স্মৃতি।
২০১৫ সালে মিউনিখে আসার পর থেকে এই শহরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেকটাই বদলেছে। প্রথমদিকে যা ছিল সম্পূর্ণ নতুন একটা জায়গা, এখন সেটাই নিজের শহরের মতো হয়ে উঠেছে। অফিস, বাড়ি, বাজার, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, সপ্তাহান্তে কোথাও ঘুরতে যাওয়া, সব মিলিয়ে একটা পরিচিত জীবন।তার মধ্যেই অলিম্পিয়া পার্ক আলাদা একটা জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় এখানে হাঁটতে বেশ ভালো লাগে। শীতের সময় আবার পুরো পরিবেশটাই বদলে যায়। কখনও বরফে ঢাকা মাঠ, কখনও কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা অলিম্পিক টাওয়ার। পর্যটকরা এসে ছবি তোলেন, আর স্থানীয় মানুষজন নিজেদের মতো সময় কাটান।
এবার সেই পরিচিত জায়গাটাকেই আবার অলিম্পিকের জন্য প্রস্তুত করার কথা ভাবা হচ্ছে।মিউনিখের প্রস্তাবের একটা বড় দিক হল ১৯৭২ সালের তৈরি পরিকাঠামোকে আবার ব্যবহার করা। অলিম্পিক স্টেডিয়াম, অলিম্পিয়া পার্ক এবং শহরের অন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গাকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতাগুলো আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণের খরচ এবং পরিবেশের উপর প্রভাব যতটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে সবাই যে একবাক্যে এই পরিকল্পনাকে সমর্থন করছেন, এমন নয়। এত বড় আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের খরচ, নিরাপত্তা, যাতায়াত ব্যবস্থা এবং শহরের আবাসন পরিস্থিতির উপর তার প্রভাব নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। মিউনিখ এমনিতেই জার্মানির অন্যতম ব্যয়বহুল শহর। প্রতি বছর অক্টোবর ফেস্টের সময় এখানে পর্যটকদের যে ভিড় হয়, তাতেই অনেক সময় শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ে। অলিম্পিকের মতো আয়োজন হলে সেই প্রস্তুতি যে আরও বড় মাপের হতে হবে, তা বলাই বাহুল্য।আবার উল্টোদিকে এটাও ঠিক, অলিম্পিক আয়োজনের সুযোগ পেলে মিউনিখের আন্তর্জাতিক পরিচিতি এবং ক্রীড়া পরিকাঠামোর উন্নতির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।তবে ব্যক্তিগতভাবে এই পুরো বিষয়টার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল সময়ের ব্যবধানটা।
১৯৭২ সালে যখন মিউনিখে অলিম্পিক হচ্ছে, তখন আমার জন্মই হয়নি। তখন কলকাতার সঙ্গে মিউনিখের কোনও সম্পর্কও ছিল না আমার। তারপর কলকাতায় বড় হওয়া, পড়াশোনা, চাকরি, কর্মসূত্রে জার্মানিতে চলে আসা। জীবনের নানা পথ ঘুরে আজ এমন একটা জায়গায় থাকি, যেখান থেকে অলিম্পিক স্টেডিয়ামে পৌঁছতে সময় লাগে মাত্র দশ মিনিট।কলকাতায় বসে যে অলিম্পিককে একসময় টেলিভিশনের পর্দায় দেখতাম, আজ তারই ইতিহাসের পাশে আমার প্রতিদিনের জীবন কাটছে।ভাবতে ভালো লাগে, যদি সত্যিই ২০৩৬ বা তার পরবর্তী কোনও বছরে মিউনিখ আবার অলিম্পিক আয়োজনের সুযোগ পায়, তাহলে হয়তো নিজের শহরেই সেই অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকতে পারব। টেলিভিশনের পর্দায় নয়, সরাসরি স্টেডিয়ামে বসে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের প্রতিযোগিতা দেখতে পারব।আর ভারতীয় খেলোয়াড়দের দেখতে পেলে তো কথাই নেই। বিশেষ করে যদি কোনও ভারতীয় প্রতিযোগী এখানে পদক জেতেন, তাহলে আনন্দটা নিশ্চয়ই একটু অন্যরকম হবে।
১৯৭২ সালে এই শহর থেকে ভারতীয় হকি দল ব্রোঞ্জ নিয়ে ফিরেছিল। তার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে ভারতীয় ক্রীড়াবিদরা আবার মিউনিখে পদকের জন্য লড়বেন, এমন সম্ভাবনাটাই বেশ রোমাঞ্চকর।অলিম্পিক শেষ পর্যন্ত মিউনিখে ফিরবে কি না, সেটা ভবিষ্যৎই বলবে। তবে ১৯৭২ সালের সেই স্টেডিয়ামটা এখন আর শুধুই অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকবে না। প্রতিবার তার পাশ দিয়ে হাঁটার সময় মনে হবে, হয়তো এখানেই আবার লেখা হবে অলিম্পিকের নতুন কোনও ইতিহাস।আর সেই ইতিহাসের সাক্ষী থাকার সুযোগ যদি সত্যিই আসে, তাহলে কলকাতায় বসে অলিম্পিক দেখার সেই ছোটবেলার আনন্দটাও যেন নতুন করে ফিরে পাব।
