সমুদ্র মন্থন থেকে কীভাবে আবির্ভূত হলেন সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধির দেবী মা লক্ষ্মী!
চিরঞ্জিত সরকার
সৌন্দর্য, ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মী। বাঙালির ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপুজোর প্রস্তুতি শুরু হলেই মনে পড়ে যায় ধানের শিষ, পদ্মফুল, লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আর সন্ধ্যার প্রদীপের কথা। কিন্তু যে দেবীকে আমরা সংসারের মঙ্গল ও প্রাচুর্যের প্রতীক হিসেবে দেখি, তাঁর আবির্ভাবের কাহিনি কতটা জানি?
পুরাণের পাতায় লক্ষ্মীর আবির্ভাবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেবতা ও অসুরের সংঘাত, অমৃতের সন্ধান এবং ক্ষীরসাগর মন্থনের এক বিস্ময়কর আখ্যান।
অমৃতের সন্ধানে দেবতা ও অসুর
পুরাণের প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, একসময় দেবতারা তাঁদের শক্তি ও প্রভাব হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। অসুরদের সঙ্গে সংঘাতে তাঁরা বিপর্যস্ত। অমরত্ব ও শক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য প্রয়োজন অমৃত। কিন্তু সেই অমৃত লুকিয়ে রয়েছে ক্ষীরসাগরের গভীরে।
বিষ্ণুর পরামর্শে দেবতা ও অসুরেরা সমুদ্র মন্থন করতে সম্মত হলেন। মন্দার পর্বত হল মন্থনদণ্ড, আর নাগরাজ বাসুকি হলেন মন্থনের রজ্জু। দেবতা ও অসুর— দুই পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শুরু হল ক্ষীরসাগর মন্থন।
এই মন্থন থেকে একে একে উঠে এল বহু মূল্যবান ও অলৌকিক বস্তু। আবির্ভূত হলেন ঐশ্বর্যের প্রতীক, দেববৈদ্য ধন্বন্তরি এবং অমৃতের পাত্র। একই মহাজাগতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে প্রকাশ পেল এক অপূর্ব সৌন্দর্যের দেবীমূর্তি—মা লক্ষ্মী।
পদ্মের ওপর আবির্ভাব
লক্ষ্মীর আবির্ভাবের বর্ণনায় পদ্মের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পদ্ম কাদাজলে জন্মালেও তার সৌন্দর্য ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ থাকে। ভারতীয় ধর্মীয় প্রতীকে তাই পদ্ম সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও বিকাশের চিহ্ন। পদ্মাসনা লক্ষ্মী যেন সেই বার্তাই বহন করেন—জগতের মধ্যে থেকেও সৌন্দর্য ও শ্রীকে ধারণ করা সম্ভব।
দেবী লক্ষ্মীকে দেখে দেবতা ও ঋষিরা মুগ্ধ হলেন। তাঁর হাতে পদ্ম, তাঁর উপস্থিতিতে শ্রী ও ঐশ্বর্যের প্রকাশ। দেবী কাকে স্বামী হিসেবে বেছে নেবেন, তা নিয়েও পুরাণের কাহিনিতে বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। লক্ষ্মী শেষ পর্যন্ত বিষ্ণুকে বরণ করেন। শ্রী ও বিষ্ণুর এই সম্পর্ক পরবর্তী হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে গভীর তাৎপর্য পায়।
বিষ্ণু বিশ্বপালনের দেবতা, লক্ষ্মী তাঁর সহধর্মিণী হিসেবে শ্রী, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক। এই যুগল রূপের মধ্যে যেন রক্ষার সঙ্গে প্রাচুর্যের, শৃঙ্খলার সঙ্গে মঙ্গলের এক প্রতীকী মিলন ঘটেছে।
লক্ষ্মী কি শুধু অর্থের দেবী?
আজকের দিনে লক্ষ্মী বলতেই অনেকের মনে আসে অর্থ, সোনা, ব্যবসায়িক সাফল্য কিংবা ধনসম্পদ। কিন্তু লক্ষ্মীর ধারণা তার চেয়ে বিস্তৃত। ‘শ্রী’ বলতে শুধু অর্থ নয়, সৌন্দর্য, কল্যাণ, মর্যাদা, উর্বরতা ও সমৃদ্ধিরও ধারণা বোঝানো হয়।
কৃষিনির্ভর বাংলায় এই সমৃদ্ধির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধান, শস্য, খাদ্য ও গৃহস্থের গোলাভরা ফসল। তাই বাংলার লক্ষ্মীপুজোয় দেবী কেবল ধনসম্পদের অধিষ্ঠাত্রী নন, তিনি অন্নের, সংসারের মঙ্গলের এবং পরিবারের সুস্থিতিরও প্রতীক।
পুরাণকথার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য
সমুদ্র মন্থনের গল্পে একটি বিষয় লক্ষণীয়। অমৃত বা লক্ষ্মীর মতো মূল্যবান প্রাপ্তির আগে দেবতা ও অসুরদের দীর্ঘ ও কঠিন মন্থনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই আখ্যানকে প্রতীকীভাবে পড়লে মনে হতে পারে, সমৃদ্ধি কোনও সহজলভ্য উপহার নয়। তার সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিশ্রম, সংঘাত, অপেক্ষা এবং প্রাপ্ত সম্পদকে ধরে রাখার দায়িত্ব।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর প্রাক্কালে এই কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমৃদ্ধি বলতে শুধু অর্থের প্রাচুর্য নয়, জীবনের সৌন্দর্য, অন্নের নিশ্চয়তা, সংসারের শান্তি এবং কল্যাণও বোঝায়।
