বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

নীলকণ্ঠ পাখির ডানায় ভর করে শিবের কাছে পৌঁছে যেত মায়ের ফেরার বার্তা

21 October, 2026 1:51 PM Lopa Bhowmik
শেয়ার করুন

বিজয়া দশমীতে আমাদের মনখারাপের পুরনো উঠোন জুড়ে আঁকা হয় কত স্মৃতির আলপনা। লিখেছেন কঙ্কণা লাহিড়ী

বিজয়া দশমী বাঙালির কাছে শুধু একটি তিথি নয়। এটি আনন্দের প্রান্তদেশে দাঁড়িয়ে বিষাদকে ছুঁয়ে দেখার দিন। যে মা চার দিন ধরে ঘরের মেয়ে হয়ে এসেছিলেন, তাঁকেই আবার বিদায় দিতে হয়। যে মুখের দিকে তাকিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা কেটেছে, সেই মুখের দিকে তাকিয়েই চোখ ভিজে ওঠে। মায়ের চোখেও যেন জমে থাকে বিদায়ের জল। সিঁদুরে রাঙা মুখ, হাতে মিষ্টির থালা, কোলাকুলির উষ্ণতা— সব কিছুর মধ্যেই মিশে থাকে বিচ্ছেদের এক অনিবার্য সুর আর হারিয়ে যাওয়া শৈশব।
এক সময় বিজয়া দশমীর দিন আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হতো নীলকণ্ঠ পাখি। সেই পাখি উড়ে যেত নদী পেরিয়ে, খেলার মাঠ ছাড়িয়ে, গঞ্জের পথ ধরে, স্কুলবাড়ির উপর দিয়ে— দূর থেকে আরও দূরে। লোকবিশ্বাস বলত, নীলকণ্ঠ পাখি গিয়ে মহাদেবকে খবর দেবে, তাঁর উমা ফিরে আসছেন কৈলাসে। মর্ত্যের মানুষ তাঁকে বিদায় জানিয়েছে। ঢাকের আওয়াজ স্তিমিত হয়েছে, ধুনোর গন্ধ মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে আর চার দিনের আনন্দের শেষে পৃথিবী জুড়ে নেমে আসছে এক অদ্ভুত মায়া-বিষণ্ণতা।
পুরাণের উমা তো হিমালয়কন্যা, শিবের ঘরণী। কৈলাস তাঁর সংসার, আর মর্ত্যে পিতৃগৃহ তাঁর বাপের বাড়ি। শরতের কয়েকটি দিনের জন্য তিনি ফিরে আসেন বাবা-মায়ের কাছে, আপনজনদের কাছে। বাংলার লোককল্পনায় সেই উমা আর দূর আকাশের কোনও দেবী নন; তিনি আমাদের ঘরের মেয়ে। তাঁর আগমনে ঘরে ঘরে উৎসব, আর তাঁর বিদায়ে ঘরে ঘরে মনখারাপ। দেবীর এই ঘরে ফেরা ও ফিরে যাওয়ার কাহিনির মধ্যে বাঙালি খুঁজে পেয়েছে নিজের জীবনের চেনা ছবি— বাপের বাড়িতে মেয়ের আসা, কয়েক দিনের হাসি-আড্ডা, তারপর আবার শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাওয়া।
এই কারণেই বিজয়ার বিষাদ এত গভীর। দেবীকে বিদায় দেওয়ার মধ্যে বাঙালি শুধু ধর্মীয় কর্তব্য পালন করে না, নিজের পারিবারিক স্মৃতি ও সম্পর্কের আবেগও প্রকাশ করে। আগমনী গানে তাই মেয়েকে ঘরে ফিরিয়ে আনার আকুলতা, আর বিজয়ার গানে তাকে বিদায় দিতে না চাওয়ার অসহায়তা। শাক্ত পদাবলির সেই চিরন্তন আর্তি— উমা, আর ক’টা দিন থাকো।
নীলকণ্ঠ পাখিকে ঘিরে থাকা লোকবিশ্বাসের মধ্যেও এই আবেগের একটি সুন্দর প্রতীকী রূপ খুঁজে পাওয়া যায়। প্রচলিত লোকাচার অনুযায়ী, বিজয়ার দিনে নীলকণ্ঠকে মহাদেবের কাছে উমার ফিরে যাওয়ার সংবাদবাহক হিসেবে কল্পনা করা হতো। নীলকণ্ঠ শিবের সঙ্গে সম্পর্কিত পাখি। তারও নীল রং। সে হয়ে উঠেছিল মর্ত্য ও কৈলাসের মধ্যে এক কল্পিত দূত। মানুষের মনে যে বিদায়ের কথা জমে থাকত, পাখির ডানায় ভর করে যেন সেই কথাই পৌঁছে যেত দেবাদিদেবের কাছে।
তবে নীলকণ্ঠ পাখি উড়িয়ে দেওয়া ছিল প্রচলিত লোকাচার ও বিশ্বাসের অংশ। এর সঙ্গে পুরাণের বিশেষ যোগ নেই। মনে রাখা দরকার, পুরাণের কাহিনি, আঞ্চলিক সংস্কার, পারিবারিক আচার এবং মানুষের কল্পনা মিলেমিশেই বাংলার উৎসবকে সমৃদ্ধ করেছে। নীলকণ্ঠকে ঘিরে এই বিশ্বাসও সেই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারেরই একটি অংশ।
সেই সময়ের বিজয়া ছিল অন্য রকম। বিসর্জনের আগে প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, ঢাকের শেষ বোল শোনা, নদীর ঘাটে ভিড়ের মধ্যে মায়ের মুখটি আর একবার দেখার চেষ্টা— এসবের সঙ্গে মিশে থাকত এক অনির্বচনীয় অনুভূতি। পাড়ার মানুষ পরস্পরকে জড়িয়ে ধরতেন, বাড়িতে বাড়িতে মিষ্টি পৌঁছত, বড়দের প্রণাম আর ছোটদের আশীর্বাদে ভরে উঠত দিন। কারও বাড়িতে নারকেল নাড়ু, কারও বাড়িতে নিমকি, কোথাও সন্দেশ কিংবা ঘরে তৈরি মোয়া। বিজয়ার মিষ্টি শুধু মুখের স্বাদ ছিল না; ছিল সম্পর্কের মাধুর্য ধরে রাখার এক সামাজিক উপলক্ষ্য।
আর ছিল সেই পুরনো আকাশ। পাড়ার মাঠ, নদীর চর, স্কুলের ফাঁকা প্রাঙ্গণ কিংবা গঞ্জের রাস্তা— সবই যেন উৎসবের অংশ হয়ে উঠত। ছোটরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত, বড়রা গল্প করতেন নীলকণ্ঠের। সেই পাখি সত্যিই শিবের কাছে খবর পৌঁছে দেবে কি না, তা নিয়ে হয়তো কারও মনে প্রশ্ন ছিল না। বিশ্বাসেরও তো একটা শৈশব থাকে। সেখানে যুক্তির চেয়ে কল্পনা বড়, প্রমাণের চেয়ে অনুভূতি সত্যি, আর একটি পাখির উড়ে যাওয়ার মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে গোটা পৃথিবীর রহস্য।
আজ আমরা জানি, নীলকণ্ঠ একটি বন্য পাখি। তাকে ধরে বন্দি করা বা উৎসবের নামে উড়িয়ে দেওয়া তার স্বাভাবিক জীবন ও কল্যাণের পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে। তাই পুরনো লোকাচারের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার অর্থ পাখিটিকে ধরে আকাশে ছুড়ে দেওয়া নয়, বরং তার স্বাধীনতাকে সম্মান করা। প্রকৃতির মধ্যে তাকে মুক্ত থাকতে দেওয়াই হোক নতুন সময়ের বিজয়া-বার্তা। ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তার প্রতিটি আচারের পুনরাবৃত্তি জরুরি নয়, তার অন্তর্নিহিত অনুভূতিটিকে বুঝে নেওয়াই বেশি জরুরি।
তবু নীলকণ্ঠ পাখির কথা মনে পড়লে মন ফিরে যায় সেই সময়ে, যখন উৎসব মানে ছিল শুধু আলোকসজ্জা বা বড় প্যান্ডেল নয়, একটি নির্দিষ্ট দিনের জন্য তৈরি হওয়া বিশেষ আবহ। দশমীর সকাল থেকেই যেন বাতাসের রং বদলে যেত। ঢাকের আওয়াজে আনন্দ থাকত, অথচ সেই আনন্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকত বিদায়ের সুর। প্রতিমার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হতো, মা বুঝি সত্যিই চলে যাচ্ছেন। ছোটবেলার সেই বিশ্বাস বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া অনুভূতি মুছে দেওয়া যায় না। আজও দশমীর দিন ঢাক বাজলে অনেকের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে নীলকণ্ঠ পাখির উড়ে যাওয়া।
একদিন যে নীলকণ্ঠ পাখি নদী, মাঠ, গঞ্জ আর স্কুলবাড়ি পেরিয়ে শিবের কাছে খবর দিতে উড়ে যেত, আজ সে অনেক দূরের স্মৃতি। কিন্তু তার উড়ে যাওয়ার কাহিনি এখনও আমাদের মনে একটি প্রশ্ন জাগায়— আমাদের উৎসব থেকে কি শুধু পাখিটিই হারিয়ে গিয়েছে, নাকি হারিয়ে যাচ্ছে সেই সহজ বিশ্বাস, সেই অবসর, সেই একসঙ্গে মনখারাপ করার সামাজিক ক্ষমতাও?
হয়তো নীলকণ্ঠ আর আমাদের চোখের সামনে উড়ে যায় না। কিন্তু বিজয়ার বিকেলে বিসর্জনের ঢাক যখন দূরে মিলিয়ে যায়, বাড়ির দরজায় যখন জমে ওঠে প্রণাম আর মিষ্টি বিনিময়ের ভিড়, তখনও কোথাও একটা অদৃশ্য পাখি ডানা মেলে। সে উড়ে যায় আমাদের শৈশবের দিকে, পুরনো পাড়ার দিকে, হারিয়ে যাওয়া মানুষদের দিকে। সে খবর দেয়— উমা ফিরে গিয়েছেন কৈলাসে। মর্ত্য আবার অপেক্ষা করবে আগামী শরতের জন্য। আর আমরা, যারা প্রতি বছর মাকে বিদায় জানাই, তারা জানি— এই মনখারাপেরও একটা নাম আছে। তার নাম বিজয়া।

প্রতিবেদন

Lopa Bhowmik