বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

প্রেম, ফুচকা আর প্যান্ডেলের আলোয় জেন জি-র পুজো

16 October, 2026 5:26 PM Sandipan Saha
শেয়ার করুন

লিখেছেন দীপ্যমান দত্ত

প্রণীশার বয়স আঠারো। জন্ম কলকাতায় নয়, বড় হয়ে ওঠাও নয়। টরন্টোর ঝকঝকে শহরে তার রোজকার জীবন। সেখানে শরৎ আসে অন্য রকম করে। গাছের পাতা ঝরে, বাতাসে ঠান্ডা নামে, শহরের রাস্তায় আলো জ্বলে। কিন্তু বাঙালির শরৎ? সে তো অন্য জিনিস। তার মধ্যে কোথাও একটা ঢাক বাজে, কাশফুল দোলে, শিউলি ঝরে আর দূর থেকে ভেসে আসে আগমনি।

প্রণীশা এত দিন এসব কথা শুনেছে। মায়ের কাছে, ঠাকুমার কাছে, কলকাতায় থাকা আত্মীয়দের কাছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছে আলোর মণ্ডপ, মানুষের ঢল, দেবী দুর্গার মুখ, অষ্টমীর অঞ্জলি। কিন্তু ফোনের পর্দায় দেখা পুজো আর নিজের চোখে দেখা পুজো যে এক নয়, সেটা সে জানত না। এ বছর তাই সে বাবার কাছে জেদ করেছিল, পুজো দেখতে কলকাতায় আসতেই হবে।

কলকাতায় পা দিয়েই প্রণীশার প্রথম বিস্ময়— এ শহর ঘুমোয় না কেন! রাস্তায় আলো, মানুষের মুখে হাসি, কোথাও ঢাক, কোথাও গান, কোথাও আবার এমন ভিড় যে সামনে এগোনোই দায়। অথচ সেই ভিড়ের মধ্যেও একটা আশ্চর্য আনন্দ। কেউ কাউকে চেনে না, তবু সবাই যেন একই উৎসবের আত্মীয়।

ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় সে বেরোল ঠাকুর দেখতে। সঙ্গে এক দূরসম্পর্কের দাদা, আর তার কয়েকজন বন্ধু। প্রণীশার পরনে নীল জিনস, সাদা টপ, কাঁধে ছোট্ট ব্যাগ। হাতে ফোন। প্যান্ডেলে ঢুকেই ছবি তুলছে, ভিডিও করছে, কখনও নিজেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘Guys, you have no idea what this feels like!’

তারপর হঠাৎ ফোনটা নামিয়ে ফেলল। সামনে দেবী দুর্গা। এত বড় প্রতিমা, এত আলো, এত মানুষের চোখে একসঙ্গে এত বিস্ময়— ক্যামেরায় কি সব ধরা যায়? প্রণীশা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হল, এত দিন সে পুজোকে দেখেছে ছবিতে, আজ পুজো তাকে দেখছে।

সপ্তমীর দিন কলকাতাকে একটু অন্য ভাবে চিনল সে। শপিং মলের চেনা খাবার নয়, দামি রেস্তরাঁর সাজানো টেবিলও নয়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়া। প্রথম ফুচকাতেই চোখ বড় বড়।

‘এত ঝাল!’ পাশ থেকে একজন হেসে বলল, ‘কলকাতায় এসে ঝাল খেতে ভয় পেলে হবে?’

ছেলেটির নাম অর্ক। বয়স উনিশ। কলেজে পড়ে। দাদার বন্ধুদের সঙ্গে তার পরিচয়। প্রণীশার বিদেশি উচ্চারণে বাংলা শুনে প্রথমে একটু অবাক হয়েছিল, তারপর থেকে তার দিকে নজরটা একটু বেশিই যাচ্ছে।

অর্ক তাকে শেখাল কীভাবে ফুচকার জল খেতে হয়, কীভাবে আলুকাবলির সঙ্গে কাঁচালঙ্কা মিশিয়ে নিতে হয়। প্রণীশা প্রথমে সাবধানে খেল, পরে নিজেই বলল, ‘আর একটু ঝাল দাও।’

অর্ক হেসে বলল, ‘তুমি তো দেখছি পুরো বাঙালি হয়ে যাবে!’

প্রণীশা চোখ পাকিয়ে বলল, ‘আমি বাঙালি নই নাকি?’

এই কথার মধ্যে যে অভিমান ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল আদর পাওয়ার ইচ্ছে। অর্ক সেটা বুঝল কি না জানা নেই। তবে সে আর হাসল না। শুধু বলল, ‘আচ্ছা, তুমি বাঙালি। এবার চলো, আলুকাবলি খাওয়াই।’

এইভাবেই শুরু হল পুজোর আর একটা গল্প।

অষ্টমীর সকাল। চারপাশে নতুন পোশাক, অঞ্জলি দেওয়ার ব্যস্ততা, শিউলি আর ধূপের গন্ধ। প্রণীশা শাড়ি পরেছে। মা যত্ন করে পরিয়ে দিয়েছেন। আয়নায় নিজেকে দেখে তার নিজেরই একটু অচেনা লাগছিল। বিদেশে সে জিনস, স্নিকার্স আর জ্যাকেটেই স্বচ্ছন্দ। আজ কপালে ছোট্ট টিপ, হাতে চুড়ি, চুলে আলগা খোঁপা।

অর্ক যখন তাকে দেখতে পেল, কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারল না।

‘কী হল?’ প্রণীশা জিজ্ঞেস করল।

‘কিছু না।’

‘মিথ্যে কথা। কিছু একটা হয়েছে।’

অর্ক একটু হেসে বলল, ‘তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।’

প্রণীশা মুখ ঘুরিয়ে নিল। বিদেশে সে প্রশংসা শুনেছে, বন্ধুদের কাছ থেকে, পরিচিতদের কাছ থেকে। কিন্তু এই কথাটার মধ্যে অন্য কিছু ছিল। হয়তো অষ্টমীর সকাল, হয়তো ঢাকের শব্দ, হয়তো সেই ছেলেটির চোখে তার জন্য একটু আলাদা আলো। প্রশংসাটা তার মনে রয়ে গেল।

সেদিন তারা অনেক ঠাকুর দেখল। কোথাও সাবেকি প্রতিমা, কোথাও আধুনিক শিল্পের বিস্ময়। কোথাও ভিড়ের চাপে হাত ধরে এগোতে হল, কোথাও আবার মণ্ডপের বাইরে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ গল্প। প্রণীশা জানতে চাইল, কলকাতার মানুষ এত কষ্ট করে, এত রাত জেগে ঠাকুর দেখে কেন?

অর্ক বলল, ‘সব কিছুর কারণ খুঁজতে নেই। কিছু কিছু জিনিস অনুভব করতে হয়।’

‘যেমন?’

‘যেমন পুজো।’

প্রণীশা একটু থেমে বলল, ‘আর প্রেম?’

অর্ক এবার সত্যিই চুপ করে গেল।

প্রণীশা হেসে উঠল। ‘কী হল? এটার উত্তর নেই?’

‘আছে। কিন্তু সেটা বলতে গেলে একটু সময় লাগে।’

‘তোমাদের কলকাতায় সব কিছুতেই এত সময় লাগে?’

‘না। কিছু কিছু ব্যাপার খুব তাড়াতাড়িও হয়ে যায়।’

কথাটা বলে অর্ক অন্য দিকে তাকাল। প্রণীশা বুঝল, তার নিজের বুকের ভিতরেও কিছু একটা খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে। ঢাকের দ্রুতলয়ে তালের মতো।

নবমীর রাতটা ছিল অন্য রকম। শহরের আলো তখন যেন আরও উজ্জ্বল। প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে তুলতে প্রণীশার ফোনের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেল। প্রথমে একটু বিরক্ত হল। তারপর ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল। অর্ক বলল, ‘এবার অন্তত কলকাতাকে সরাসরি দেখো।’

তারা হাঁটতে লাগল। রাস্তার ধারে চায়ের দোকান, ভিড়ের মধ্যে হাসতে থাকা বন্ধুরা, দূরে ঢাকের শব্দ, আর আকাশের গায়ে উৎসবের আলো। প্রণীশা হঠাৎ বলল, ‘জানো, আমি ফিরে গিয়ে এই পুজোর কথা সবাইকে বলব।’

‘কী বলবে?’

‘বলব, কলকাতায় একটা উৎসব হয়, যেখানে মানুষ শুধু ঠাকুর দেখতে বেরোয় না। সবাই একটু করে ছোটবেলায় ফিরে যায়।’

অর্ক বলল, ‘আর?’

‘আর বলব, সেখানে ফুচকা খেতে হয়, আলুকাবলি খেতে হয়, রাত জেগে হাঁটতে হয়।’

‘আর?’

প্রণীশা এবার তার দিকে তাকাল। ‘আর বলব, সেখানে একজন ছেলে আছে, যে খুব ভালো ফুচকার দোকান চেনে।’

অর্ক হেসে ফেলল। ‘শুধু এইটুকু?’

প্রণীশা উত্তর দিল না। শুধু হাঁটার সময় তার হাতটা অর্কের হাত ছুঁয়ে গেল। একবার। তারপর আবার। তৃতীয়বার আর সরিয়ে নিল না।

এই বয়সের প্রেমে খুব বড় কোনও ঘোষণা লাগে না। লাগে না দীর্ঘ প্রতিশ্রুতি, ভবিষ্যতের জটিল হিসেব, কিংবা সম্পর্কের নামকরণ। কখনও কখনও একটা হাত ছুঁয়ে থাকা, ভিড়ের মধ্যে কাউকে খুঁজে নেওয়া, কিংবা বিদায়ের কথা উঠলে হঠাৎ মন খারাপ হয়ে যাওয়াই যথেষ্ট।

দশমীর সকালে প্রণীশার মনটা খারাপ ছিল। বিসর্জনের কথা শুনে তার মনে হচ্ছিল, এত তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়ে যায় কেন? কয়েকটা দিন আগেও কলকাতা ছিল তার কাছে ছবির শহর। এখন এই শহরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে কিছু গন্ধ, কিছু শব্দ, কিছু রাস্তা, আর একজন মানুষের মুখ।

অর্ক তাকে বলল, ‘আবার আসবে তো?’

প্রণীশা বলল, ‘জানি না।’

‘জানি না মানে?’

‘আবার আসার একটা কারণ তো চাই।’

অর্ক একটু ইতস্তত করে বলল, ‘কারণ কি খুব কঠিন?’

প্রণীশা মুচকি হাসল। ‘না। তবে কারণটা তোমাকেই খুঁজতে হবে।’

বিদায়ের আগে তারা শেষবারের মতো ফুচকা খেল। প্রণীশা এবার আর ঝালে চোখ কুঁচকাল না। অর্ক বলল, ‘দেখলে? কলকাতা তোমাকে শিখিয়ে দিয়েছে।’

‘কী শিখিয়েছে?’

‘ঝাল সহ্য করতে।’

প্রণীশা হেসে বলল, ‘সব ঝাল নয়। কিছু কিছু ঝাল আবার ভালোও লাগে।’

অর্ক কথাটার মানে বুঝেছিল কি না, জানা গেল না। তবে তার মুখের হাসিটা একটু অন্য রকম হয়ে গিয়েছিল।

বিমানে ফেরার সময় প্রণীশা ফোনের ছবিগুলো দেখছিল। হাজার হাজার আলো, অসংখ্য প্রতিমা, ভিড়ের মধ্যে হাসিমুখ, ফুচকার দোকান, আলুকাবলির শালপাতার ঠোঙা। সব ছবির মধ্যে একটা ছবিতে তার চোখ আটকে গেল। ছবিটা খুব সাধারণ। প্যান্ডেলের আলোয় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সে আর অর্ক। দুজনের কেউ ক্যামেরার দিকে তাকায়নি। দুজনেই যেন অন্য কারও দিকে তাকিয়ে হাসছে।

ছবিটার কোনও বিশেষত্ব নেই। তবু সেটাই সে বারবার দেখল।

জেন জি-র প্রেমকে অনেক সময় আমরা শুধু মোবাইল, dating app, reels আর casual relationship-এর ভাষায় বুঝতে চাই। অথচ তাদেরও প্রথম প্রেমে বুক ধড়ফড় করে, বিদায়ের সময় মন খারাপ হয়, কোনও একটি শহর হঠাৎ বিশেষ হয়ে ওঠে। পার্থক্যটা হয়তো প্রকাশের ভাষায়। তারা অনুভূতিকে আড়াল করতে জানে, আবার মুহূর্তের মধ্যে তা প্রকাশও করে ফেলে। ছবি তোলে, স্টোরি দেয়, আবার এমন কিছু অনুভূতি নিজের কাছেও রেখে দেয়, যা কোনও ক্যাপশনে লেখা যায় না।

প্রণীশার কাছে কলকাতার পুজো তাই শুধু একটি উৎসব হয়ে রইল না। হয়ে রইল একটি শহরের সঙ্গে প্রথম পরিচয়, নিজের শিকড়কে নতুন করে ছোঁয়া, আর আঠারো বছরের জীবনে প্রথম এমন একটি অনুভূতি, যার নাম সে হয়তো এখনও ঠিক করে উঠতে পারেনি।

পুজো শেষ হয়েছে। দেবী ফিরে গিয়েছেন কৈলাসে। কলকাতার আলো একে একে নিভছে।

কিন্তু বিদেশের এক শহরে বসে প্রণীশা যখন ফোনের পর্দায় কলকাতার সেই ছবিটা খুলে দেখে, তখন তার মনে হয়— সব বিসর্জন কি সত্যিই শেষ হয়ে যায়?

কিছু কিছু পুজো থেকে যায়। কিছু কিছু শহর থেকে যায়। আর কিছু কিছু মানুষ, যাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল মাত্র কয়েকটা দিনের জন্য, তারা অজান্তেই পরের শরতের অপেক্ষা হয়ে ওঠে।

এবছর প্রণীশা পুজোয় আসতে পারেনি। পরীক্ষার জন্য। হয়তো আগামী বছর আবার আসবে সে। আবার ফুচকা খাবে, আলুকাবলি খাবে, ঠাকুর দেখবে। হোয়াটসঅ্যাপে তাদের কথা হয়। অর্ক বলে, ‘এবছর আমার মনখারাপের পুজো।’

প্রণীশা বলে, ‘আমার হয়ে একটু বেশি ফুচকা খেও।’

অর্ক বলে, ‘এবছর আমার প্রতীক্ষার পুজো। আমি জানি, তোমার উপস্থিতিই আমার কাছে উৎসব। তার জন্য কোনও প্যান্ডেলের বা আলোর প্রয়োজন হবে না। আমি এটাও বিশ্বাস করি, কিছু কিছু আলো একবার জ্বলে উঠলে আর সহজে নেভে না। থেকে যায় আজীবন।

দূর টরন্টো শহরে বসেও প্রণীশা পেল শিউলির গন্ধ। আহঃ! চোখের কোণটা তার চকচক করে উঠল।

 

প্রতিবেদন

Sandipan Saha