নীল ড্রাম হত্যাকাণ্ড, নেভি অফিসারের স্ত্রী ও প্রেমিককে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ মীরাট আদালতের
মীরাট: ২০২৫ সালের ৪ মার্চ মীরাটের ব্রহ্মপুরীতে মার্চেন্ট নেভি অফিসার সৌরভ রাজপুতকে খুন করে তাঁর দেহ টুকরো করে নীল ড্রামে ভরে সিমেন্ট দিয়ে সিল করে দেওয়া হয়েছিল। দেশজুড়ে আলোড়ন ফেলে দেওয়া সেই ‘নীল ড্রাম’ হত্যা মামলায় এবার চূড়ান্ত রায়ঘোষণা আদালতের। সৌরভের স্ত্রী মুসকান রাস্তোগি এবং তার প্রেমিক সাহিল শুক্লাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা শোনাল মীরাট জেলা আদালত।
শুনানি চলাকালীন মহাভারতের প্রসঙ্গ তুলে বিচারক জানান, শাস্তিও ধর্মেরই এক রূপ। আদালত সূত্রে জানা গেছে, ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে কারাগার থেকে বিচার প্রক্রিয়ায় যোগ দিয়েছিল মুসকান ও সাহিল। রায়ের সময় আদালতের ভেতরে উপস্থিত ছিল দুই পক্ষেরই পরিবার। মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণার পর কোর্টরুম চত্বর ‘ভারত মাতা কি জয়’ ধ্বনিতে ফেটে পড়ে। আদালতের বাইরে শুরু হয় জয়োল্লাস। দীর্ঘ ১৩ মাস ধরে চলা বিচারপর্ব এবং মোট ১২৬টি শুনানির পর ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত মুসকান ও সাহিলকে সৌরভের খুনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করেছিল। সাজা ঘোষণার ওপর সওয়াল-জবাবের জন্য দুই অপরাধীকে ১৫ দিন সময় দেওয়া হয়। অপরাধের নৃশংস প্রকৃতি এবং ট্রায়ালে সংগৃহীত অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে সরকারি আইনজীবী সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ ফাঁসির আর্জিই জানিয়েছিলেন।
রায় ঘোষণার আগে সরকারি কৌঁসুলি কৃষ্ণ কুমার চৌবে জানান, সুপ্রিম কোর্টের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায়ের কথা মাথায় রেখেই গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক ও উপযুক্ত শাস্তির ওপর জোর দিয়েছে আদালত। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “আদালত মুসকান রাস্তোগি এবং সাহিল শুক্লাকে সৌরভ রাজপুত হত্যাকাণ্ডে সম্পূর্ণ দোষী সাব্যস্ত করেছে।” বিচারকও পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন, জঘন্য অপরাধের অপরাধীদের সবসময় উপযুক্ত ও কঠোরতম শাস্তি পাওয়া উচিত। দীর্ঘ এই ট্রায়ালে আদালতের সামনে মোট ২২ জন সাক্ষীকে পেশ করা হয়। নীল ড্রাম, সিমেন্ট, ধারালো ছুরি ও অপরাধে ব্যবহৃত অন্যান্য রান্নার বাসনপত্র যে দোকানগুলি থেকে কেনা হয়েছিল, সেগুলির বিক্রেতা ও মালিকদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। অপরাধের আগে ও পরে অভিযুক্তরা কোন কোন হোটেলে আত্মগোপন করেছিল, তার জন্য হোটেল ম্যানেজার ও রেকর্ড খতিয়ে দেখা হয়। তাদের চলাফেরার ওপর নজর রাখতে ক্যাব চালকদেরও জেরা করেছিলেন তদন্তকারীরা।
কী ঘটেছিল সেই নীল ড্রাম হত্যাকাণ্ডে?
আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ মার্চ মীরাটের ব্রহ্মপুরী এলাকায় সৌরভকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় খুন করে তাঁরই স্ত্রী মুসকান এবং তার প্রেমিক সাহিল। পরিকল্পনা মাফিক সৌরভের দেহ কেটে টুকরো করা হয় এবং সমস্ত অবশেষ একটি বড় নীল ড্রামে ভরে সিমেন্ট দিয়ে সিল করে দেওয়া হয়।
পরে ব্রহ্মপুরীর ওই দম্পতির বাড়ি থেকেই উদ্ধার হয় সেই গলিত দেহাবশেষ, যা দেখে আঁতকে উঠেছিলেন তদন্তকারী পুলিশকর্তারাও। এরপরই পুলিশ মুসকান ও সাহিলকে গ্রেপ্তার করে। দেহ লুকোনোর এই অভিনব ও গা শিউরে ওঠার মতো কায়দার কারণে মামলাটি দ্রুত দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে, আর ‘নীল ড্রাম’ হয়ে ওঠে তদন্তের অন্যতম প্রধান সূত্র।
৩০ সেপ্টেম্বর মুসকান ও সাহিল দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন নিহত সৌরভের মা রেনু দেবী এবং ভাই রাহুল। তাঁরা দুই অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ ফাঁসির দাবি জানান। বিচারব্যবস্থার ওপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে জানিয়ে তাঁরা বলেছিলেন, এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের যেন উপযুক্ত বিচার হয়।
