মৃত্যুর পর সামনে এল অভিনেতা নানা পাটেকরের অন্য এক পরিচয়
নানা পাটেকরকে আমরা চিনি অভিনেতা হিসেবে। তাঁর কণ্ঠ, চোখের দৃষ্টি, সংলাপ বলার ভঙ্গি— সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের তীব্রতা। কখনও তিনি পুলিশ অফিসার, কখনও সেনা অফিসার, কখনও রুক্ষ অথচ ভিতরে নরম কোনও মানুষ। চরিত্রটি ভালো হোক বা মন্দ, সবক্ষেত্রেই তিনি চরিত্রটিকে অসাধারণ দক্ষতায় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু পর্দার সেই কঠিন মানুষটির জীবনে এমন একটি অধ্যায় ছিল, যা কোনও সিনেমার চিত্রনাট্য নয়। একেবারে তা রূঢ় বাস্তব।
১৯৯৯-এর কার্গিল যুদ্ধ। সীমান্তে তখন ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ চলছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ সেনাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। আর সেই সময় বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা নানা পাটেকরের মনে হল, শুধু দূর থেকে সমর্থন জানিয়ে নয়, তিনি নিজেই যেতে চান যুদ্ধক্ষেত্রে।
তখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন জর্জ ফার্নান্ডেজ। নানার কথায়, তিনি তাঁর কাছে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। প্রথমে তাঁকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। কারণ একজন অভিনেতা তো আর ইচ্ছেমতো যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে থাকতে পারেন না।
কিন্তু নানা পিছিয়ে যাননি। তিনি তাঁকে বোঝান, সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ তাঁর আগে থেকেই রয়েছে। ‘প্রহার’ ছবির জন্য তিনি মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির সঙ্গে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। কমান্ডো ট্রেনিংও করেছিলেন। জাতীয় স্তরে রাইফেল শুটিংয়ের অভিজ্ঞতাও ছিল তাঁর।
শেষ পর্যন্ত অনুমতি মিলেছিল। নানা চলে গেলেন কার্গিলে। যুদ্ধ দেখতে নয়, সৈনিকদের সঙ্গে থাকতে। সেখানে নানা সেনাদের সঙ্গে এক পোস্ট থেকে অন্য পোস্টে ঘুরছিলেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিবেশের মধ্যে ছিলেন। তিনি প্রায় ৬০ দিন সেনাদের সঙ্গে ছিলেন। দ্রাস, লে, কুপওয়ারা, বারামুলা, সোপোর সহ বিভিন্ন সামরিক এলাকায় তিনি সেনাদের সঙ্গে ঘুরেছেন। একসময় তিনি QRT বা Quick Reaction Team-এর সদস্যও হয়েছিলেন। এভাবেই তিনি তাঁর দেশপ্রেমকে প্রকাশ করেছিলেন।
সেই ৬০ দিনের সেই অভিজ্ঞতা শুধু মানসিক ছিল না, শারীরিকভাবেও তাঁকে বদলে দিয়েছিল। নানা বলেছিলেন, কার্গিলে যাওয়ার সময় তাঁর ওজন ছিল ৭৬ কেজি। ফিরে আসার সময় তা কমে দাঁড়ায় ৫৬ কেজি। অর্থাৎ মাত্র দু’মাসে ২০ কেজি ওজন কমে গিয়েছিল। তারপরও তাঁর কথায় কোনও আত্মপ্রচারের সুর ছিল না।
নানার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক অবশ্য কার্গিল থেকে শুরু হয়নি। ১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ ছবির জন্য তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে কঠোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ছবিতে তিনি একজন সেনা অফিসারের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন এবং ছবিটি পরিচালনাও করেছিলেন। সেই প্রশিক্ষণই পরবর্তী সময়ে তাঁর সেনাবাহিনীর সঙ্গে বাস্তব সম্পর্কের ভিত তৈরি করে। পরে তিনি টেরিটোরিয়াল আর্মির সঙ্গে যুক্ত হন এবং সম্মানসূচক লেফটেন্যান্ট কর্নেলের মর্যাদাও পান।
তাই কার্গিলে তাঁর যাওয়াটা নিছক কোনও তারকার আবেগের সিদ্ধান্ত ছিল না। তাঁর আগে থেকেই সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল এবং সেনাবাহিনীর জীবন সম্পর্কে বাস্তব ধারণাও ছিল।
