নানার মৃত্যুতে ছায়াহীন মহারাষ্ট্রের কৃষকরা
অর্জুন চক্রবর্তী
অভিনেতা
অবিশ্বাস্য! অভাবনীয়! এভাবেও চলে যাওয়া যায়? কয়েক সপ্তাহ আগেই তো কথা হল। তখন ঘুণাক্ষরেও মনে হয়নি ওই কথাই শেষ কথা! পাঁচ-ছ’দিন পরেই আর্মির একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কলকাতায় আসার কথা ছিল নানার। সে কথাও আর রাখা হল না! ৪৪ বছরেরও বেশি আগের পরিচয়। একটা রাতের কয়েকটা ঘণ্টায় সব ওলোটপালোট হয়ে গেল! চিনতাম আগে থেকেই। তবে এন চন্দ্র পরিচালিত ১৮৮৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অঙ্কুশ’ ছবিতে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে পরিচয় গাঢ় হল। মজবুত হল বন্ধুত্বের সেতু। যে সেতু শেষদিন পর্যন্ত অটুট ছিল। এই ছবিতে কাজ করতে গিয়ে যেন এক অন্য নানা পাটেকরকে খুঁজে পেলাম। যাঁর বাইরেটা হয়ত কঠোর, কঠিন। ভেতরটা ফুলের মতো সতেজ, সুন্দর। শিরদাঁড়া সোজা, অটুট। যা আমৃত্যু বজায় রেখেছিলেন নানা। জীবনে কখনও কারোর মোসাহেবি করেননি। নিজের আত্মমর্যাদা আর প্রতিভায় ভর করে আমৃত্যু মাথা উঁচু করে বেঁচেছেন। কজন পারে এমনটা? একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি অভিনয়ের প্রতি ডেডিকেশন ঠিক কতটা হতে পারে। ‘অঙ্কুশ’-এর সময় প্রত্যেকটা শটের আগে আমরা নিজেদের মধ্য আলোচনা করতাম। একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ছবিতে একটা সিন ছিল, যেখানে নানা আমকে বোঝাবেন যে, আমি একজন তরুণ ইঞ্জিনিয়র। আমার নিজের কাজ, নিজের পথে হাঁটাটাই হতে পারে সঠিক সিদ্ধান্ত। সেখানে একটা কান্নার সিন ছিল। ওই সিনটা করতে গিয়ে নানা আমাকে সত্যি সত্যিই এত জোরে একটা চড় কষিয়ে দেয় যে আমার চোখ দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জল গড়িয়ে পড়ে। সেই সিনটা এতটা জীবন্ত হয়ে উঠেছিল শুধু নানার কারণে। নানার সঙ্গে আমার আরও একটা ছবি করার কথা হয়েছিল। পরিচালক ছিলেন মেরাজ।
অনেকেই জানেন না, নানা একটা এনজিও চালাতেন। মহারাষ্ট্রের দুঃস্থ কৃষকদের চাষবাষের জন্য ঋণ দিতেন তিনি। যদিও সেটা নামেই ঋণ। আসলে নানা কৃষকদের বিনা সুদে টাকা ধার দিতেন। সবথেকে বড় কথা সেই ধার শোধ দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনও সময়ও থাকত না। যে যখন খুশি, যখন তার সুবিধে তখন শোধ দিতে পারতেন। নানার তরফ থেকে কখনও কোনও রকম জোরজুলুম থাকত না টাকার আদায়ের জন্য। আমাকেও তো কতবার বলেছেন, ওখানে পড়ে আছিস কেন? চলে আয়। দুজনে একসঙ্গে এনজিও-র কাজকর্ম করব। যাওয়া আর হল কই? আসলে নানার মতো মানুষেরা শুধু দিতেই আসেন। বিনিময়ে কখনও কিছু প্রত্যাশা করেন না। তারপর একদিন সবাইকে হতবাক করে, আচমকাই জীবনের লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন থেকে চির অবসর নেন। ভালো থেকো বন্ধু…অলবিদা…।
