বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
রবীন্দ্র সরোবরে সাঁতার শিখতে গিয়ে মৃত্য়ু শিক্ষার্থীর ফারাক্কায় দ্রুত গতিতে চলছে লাইন মেরামতির কাজ মালদা মেডিকেলে শিশুমৃত্য়ুর জের, সাসপেন্ড সুপার এবার রাজ্য়ের মডেল স্কুল প্রকল্পে সিএম শ্রী ইন্সটিউট, ঘোষণা মুখ্য়মন্ত্রীর

তারাপীঠের আগুন ও দুর্নীতির রিপোর্ট কার্ড

18 August, 2026 3:15 PM admin
শেয়ার করুন

সন্দীপন বিশ্বাস : তারাপীঠের প্রাণঘাতী আগুন নিভে গিয়েছে। দমকলের গাড়ি ফিরে গিয়েছে। উদ্ধারকাজ শেষ হয়েছে। হাসপাতালের করিডরে হয়তো এখনও স্বজন হারানো মানুষের কান্নার প্রতিধ্বনি উঠছে। সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছে একটি সংখ্যা, নয়। অর্থাৎ সেই আগুন কেড়ে নিয়েছে নয়জন পুণ্যার্থীর প্রাণ। শুধু সংখ্যার বিচারে সবসময় মৃত্যুকে বোঝা যায় না। সংখ্যা দিয়ে প্রশাসনের গাফিলতি বোঝা যায় না। বোঝা যায় না একটা পরিবার কী হারাল! শুধু ক্ষতিপূরণের অঙ্কে সেই শোক, সেই হারানোকে পূরণ করা যায় না।

তারাপীঠে পুণ্যার্থীদের মধ্যে কেউ এসেছিলেন পুজো দিতে, কেউ এসেছিলেন তারা মায়ের কাছে একটু শান্তির আশায়। কিন্তু সেই তীর্থযাত্রার আনন্দ শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে শোকযাত্রায়। ১৭ আগস্ট ভোরে তারাপীঠের একটি হোটেলে আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন নয়জন। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের পাঁচজন ছিলেন। এই সংবাদটুকুর বাইরে থেকে যায় অনেক প্রশ্ন। বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কয়েকদিন হইচই হয়, আবার গতানুগতিকভাবে সব স্তিমিত হয়ে যায়। ঢাকা পড়ে যায় সব প্রশ্ন। শোকের ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকে মৃতের পরিবার। প্রশ্নটা তাই শুধু কীভাবে আগুন লাগল, তা নয়। প্রশ্ন হল, আগুন লাগার পরে মানুষ বেরিয়ে আসতে পারলেন না কেন? কাদের গাফিলতি আর উদাসীনতায় প্রাণ গেল এতগুলি মানুষের? এরপর প্রশাসন কী সব ভুলে যাবে? আবার কিছুদিন পর আরও একটি দুর্ঘটনা একইভাবে কেড়ে নেবে মানুষের প্রাণ?

প্রাথমিক তদন্তে যে তথ্যগুলি সামনে আসছে, তা আরও উদ্বেগজনক। হোটেলের পিছনের জরুরি দরজা বন্ধ ছিল বলে অভিযোগ। ছাদের দরজারও একই অবস্থা ছিল। আগুনের ধোঁয়ায় আটকে পড়া মানুষগুলির সামনে তখন বেরিয়ে আসার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই মুহূর্তটুকুর কথা ভাবলে কি মানুষ হিসাবে আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যায় না? প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ তারাপীঠে যান মায়ের কাছে। তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কাদের? শোনা যাচ্ছে, দুর্নীতির অতলে তলিয়ে গিয়েছে টিআরডিএ (তারাপীঠ রামপুরহাট উন্নয়ন পর্ষদ)। কাটমানি, তোলাবাজি সহ আর্থিক দুর্নীতি, অব্যবস্থা ইত্যাদি। উন্নয়নের নামে পুণ্যার্থীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা তোলা হয়েছে। অথচ সেই টাকা উন্নয়নের কাজে সেভাবে ব্যবহার করা হয়নি বলে অভিযোগ। বহু নেতা তোলাবাজির টাকায় স্করপিও চড়ে ঘুরছেন। নতুন সরকারের উচিত, এই দুর্নীতির পর্দা ফাঁস করে দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা। অভিযোগে দুষ্ট হয়েছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী তথা টিআরডিএর অন্যতম কর্তা আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। দুর্ঘটনার আগেই তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। মূলত দুর্নীতির অভিযোগের চাপ তিনি সহ্য করতে পারেননি। তাঁর সুইসাইড নোটে বলেছেন, তিনি দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত নন। যে যে ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুযোগ থাকে, সেসব ক্ষেত্রে তাঁর কোনও ভূমিকা ছিল না বলে সেই চিঠিতে জানিয়েছেন। তাহলে প্রকারান্তরে স্বীকার করা হয়েছে যে, দুর্নীতি সেখানে হয়েছিল। এখন বর্তমান সরকারের কাজ সেই দুর্নীতির শিকড় উপড়ে দোষীদের টেনে এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা।

আমরা প্রায়ই দুর্ঘটনার পরে তদন্তের কথা বলি, কমিটি হয়, রিপোর্ট তৈরি হয়। কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলাও হয়। তারপর সময় চলে যায়। মানুষের স্মৃতি থেকে ঘটনাটি ধীরে ধীরে মুছে যায়। কিন্তু তারপরও আর একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এসে আগের স্মৃতিকে ফিরিয়ে দেয় এবং নীরবে বলে যায়, সেই গাফিলতির ট্রাডিশন সমানে চলেছে। কোথাও তার এতটুকুও পরিবর্তন হয়নি।

তারাপীঠ শুধু একটি তীর্থস্থান নয়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সেখানে যান। উৎসব বা বিশেষ তিথিতে সেই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। সেই মানুষের থাকার জন্য অসংখ্য হোটেল, লজ, অতিথিশালা তৈরি হয়েছে। একই ছবি রাজ্যের অন্যান্য তীর্থস্থান, পর্যটনকেন্দ্র এবং শহরগুলিতেও দেখা যায়। তাই আজ একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠবে, বাংলার সমস্ত হোটেল, লজ, গেস্টহাউস এবং বিভিন্ন ভবনে কি সত্যিই অগ্নি নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা হয়? শুধু কাগজে ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট থাকলেই কি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়? নাকি নিয়মিত প্রশাসকদের পরিদর্শনের দরকার হয়?

সব প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনকে দিতে হবে। হোটেল মালিকদের দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট দফতরকে দিতে হবে। কারণ নিরাপত্তা কোনও ব্যবসায়িক খরচ নয়। নিরাপত্তা মানুষের জীবনের মূল্য, তার অধিকার। আমাদের সমাজে একটা অদ্ভুত প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিপদ না ঘটলে আমরা নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিই না। আগুন না লাগা পর্যন্ত ফায়ার এক্সিট হয় স্টোররুম। দুর্ঘটনা না হওয়া পর্যন্ত সিঁড়ি হয় মাল রাখার জায়গা। বিপর্যয় না আসা পর্যন্ত অ্যালার্ম, প্রশিক্ষণ, জরুরি মহড়া—সবই অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। তারপর যখন মৃত্যু আসে, আমরা বলি খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। না, সব মৃত্যুকে দুর্ভাগ্য বলে দায় এড়ানো চলবে না। এইসব মৃত্যুর অদৃশ্যে থাকে আমাদের অবহেলা, আমাদের ব্যর্থতার রিপোর্ট কার্ড। আর সেই অবহেলার নাম যদি হয় প্রশাসনিক গাফিলতি, নিয়ম না মানা বা নজরদারির অভাব, তাহলে সেই মৃত্যুর জবাবদিহি চাইতেই হবে।

প্রতিবেদন

admin