বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

সারাজীবন মাটির সুরে বিভোর থেকেছেন শচীন কর্তা

01 October, 2026 3:20 PM Sandipan Saha
শেয়ার করুন

আজ ১ অক্টোবর জন্মদিন সুরসাধক শচীন দেব বর্মণের। গ্রামবাংলার মাটির সুর দিয়ে কীভাবে তিনি দেশের মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন,  লিখেছেন দীপ্যমান দত্ত

আজ শচীন দেব বর্মণের জন্মদিন। ১৯০৬ সালে আজকের দিনে অর্থাৎ ১ অক্টোবর কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। শচীনকর্তা মানে ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের এমন এক অধ্যায়, যেখানে রাজপরিবারের ঐতিহ্য, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাধনা আর বাংলার মাটির গন্ধ একাকার হয়ে গিয়েছিল। ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক যোগ থাকলেও তাঁর সঙ্গীতের আসল শিক্ষালয় ছিল প্রাসাদের বাইরের পৃথিবী। নদী, নৌকা, মাঠ, গ্রামবাংলা এবং সাধারণ ও শ্রমজীবী মানুষের গান। কৃষক, মাঝি, বাউল, ফকির সবারর কাছ থেকেই তিনি সুর কুড়িয়ে নিতেন। সারা জীবন জীবনের সুর খুঁজে বেরিয়েছেন তিনি।

শচীন দেব বর্মণের সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এখানেই। তিনি লোকসঙ্গীতকে নিছক ‘লোকগান’ হিসেবে ব্যবহার করেননি,তার ভিতরের আবেগ, ছন্দ এবং সুরের চলনকে নিয়ে তৈরি করেছিলেন আধুনিক জনপ্রিয় গান। পূর্ববঙ্গের ভাটিয়ালি, বাউল, কীর্তন, সারিগান, এইসব সুরধারা তাঁর সঙ্গীতে বারবার ফিরে এসেছে। কিন্তু সেই সুরকে তিনি এমনভাবে সাজিয়েছেন যে তা গ্রামের নদীর ঘাট পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছে মুম্বইয়ের স্টুডিওতে, তারপর সারা ভারতের শ্রোতার ঘরে।

তাঁর এই ক্ষমতার সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ হয়তো ‘ও রে মাঝি, মেরে সাজন হ্যায় উস পার’। বন্দিনী-র এই গানটিতে মাঝির ডাক যেন শুধু নদীর ওপারের মানুষকে নয়, জীবনেরই কোনও অদৃশ্য গন্তব্যকে খুঁজছে। আবার গাইড-এ তাঁর নিজের কণ্ঠে ‘ওয়াহাঁ কৌন হ্যায় তেরা’ একই সঙ্গে পথের গান, একাকিত্বের গান এবং দর্শনের গান। তাঁর কণ্ঠের মায়ালু ও উদাসীনতার গভীর টান সেই গানকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল। ‘সুন মেরে বন্ধু রে’, ‘সফল হোগি তেরি আরাধনা’-তেও তাঁর নিজস্ব কণ্ঠ হয়ে উঠেছে গানের আবহেরই অংশ। ‘সফল হোগি তেরি আরাধনা’-র জন্য ১৯৭০ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পুরুষ প্লেব্যাক গায়কের সম্মানও পান তিনি।

তবে শচীন কর্তার পরিচয় শুধু গায়ক হিসেবে নয়, তাঁর সুরকার সত্তাই তাঁকে কিংবদন্তি করেছে। পিয়াসা-র ‘জানে ওহ ক্যয়সে লোগ থে’, কাগজ কে ফুল-এর ‘ওয়াক্ত নে কিয়া ক্যা হাসিন সিতম’,গাইড-এর ‘আজ ফির জিনে কি তমন্না হ্যায়’, আরাধনার-র ‘মেরে সপ্নো কি রানি’, ‘কোরা কাগজ থা ইয়ে মন মেরা’ অভিমান-এর ‘তেরে মেরে মিলন কি ইয়ে রৈনা’-র মতো গান তাঁর সুরের বিস্তার দেখায়। এসব গান আজও জনপ্রিয়।

মজার বিষয়, এত জনপ্রিয়তার মধ্যেও তাঁর সুরের কোনও বাঁধাধরা ফর্মুলা ছিল না। কখনও লোকসুর, কখনও শাস্ত্রীয় রাগ, কখনও পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার, সবকিছুকেই প্রয়োজনমতো নিজের সুরের মধ্যে টেনে নিতেন। বাজি, ট্যাক্সি ড্রাইভার, দেবদাস, পিয়াসা, কাগজ কে ফুল, গাইড, আরাধনা, অভিমান, প্রতিটি পর্বেই তাঁর সঙ্গীতের ভাষা কিছুটা বদলেছে। সমালোচক ও গবেষকদের মতে, তাঁর সুরের এই বৈচিত্র্যই তাঁকে অন্য অনেক সমসাময়িক সুরকারের থেকে আলাদা করে।

আর মানুষ শচীন দেব বর্মণ! তিনিও কম আকর্ষণীয় ছিলেন না। রাজপরিবারের সন্তান হয়েও তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তাঁর ফুটবলের প্রতি প্রবল টান ছিল, বিশেষ করে ইস্টবেঙ্গলের প্রতি। এ নিয়ে একবার বিশেষ ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন গুরুদত্তের ছবির জন্য একটা মেলোডি সুর তৈরি করছিলেন তিনি। সেই সময় খবর আসে ইস্টবেঙ্গল হেরে গিয়েছে। ব্যস! মাথায় উঠল সুর ভাঁজা। রইল পড়ে সবকিছু। সামনে বসা গুরুদত্তকে বলে দিলেন, আজ আর আনন্দের গান তৈরি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। দুঃখের গান যদি থাকে তো বলো, আমি করে দেব। সেই কথা শুনে গুরুদত্ত হেসে ফেলেছিলেন।

আরেকটি ঘটনা। কুমিল্লা-ত্রিপুরার দিনগুলিতে রাতের অন্ধকারে তাঁর বাঁশির সুর ভেসে উঠত। স্থানীয় মানুষ নাকি সেই সুর শুনেই বুঝে যেত ‘শচীন কর্তা’ বাড়ি ফিরে এসেছেন।

শচীন দেব বর্মণের জন্মদিনে তাই তাঁকে শুধু ‘মহান সুরকার’ বললে হয়তো কম বলা হবে। তিনি দেখিয়ে গিয়েছেন, জনপ্রিয় হতে গেলে মাটিকে ছেড়ে যেতে হয় না; বরং নিজের মাটির সুরকেই নতুন ভাষায় পৌঁছে দিতে হয় মানুষের কাছে।

১৯৩৮ সালে তাঁর সঙ্গে বিয়ে হয় মীরা দেব বর্মণের। ত্রিপুরা রাজপরিবারের ছেলে শচীন সেদিন ঘোড়ায় চড়ে, তরোয়াল উঁচিয়ে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন। তাঁর বিয়েতে নহবতে সানাই বাজিয়েছিলেন আলি হুসেন খান। মীরা নিজে ছিলেন অত্যন্ত গুণী শিল্পী। আড়ালে থেকে সবসময় স্বামীকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্য করে গেছেন। মীরা না থাকলে হয়তো আমরা পূর্ণ শক্তির শচীনকে পেতাম না।

 

প্রতিবেদন

Sandipan Saha