দলীয় কার্যালয়ে হামলা, অভিযোগ না পেয়ে ৩ অভিযুক্তকে ছেড়ে দিল পুলিশ
সংবাদদাতা, সিউড়ি: বীরভূমের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা অনুব্রত মণ্ডলের চোখের সামনেই সিউড়ির তৃণমূল কার্যালয়ে তাণ্ডব চালায় একদল যুবক। বুধবার বিকেলের এই ঘটনায় তৎক্ষণাৎ তিনজনকে আটক করেছিল পুলিশ, কিন্তু পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এর পরেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। থানায় অনুব্রত কোনও অভিযোগ না করায়, রাতেই তাদের ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রের খবর, গণতান্ত্রিক তৃণমূলের জেলা সভাপতি অনুব্রত নিয়মিত সিউড়ির ওই কার্যালয়ে এসে বসছিলেন। বুধবার বিকেলে গাছের ডাল, চ্যালাকাঠ ও লাঠি হাতে কয়েকজন দোতলায় তাঁর ঘরে ঢুকে পড়েন। অনুব্রতকে চেয়ারে বসিয়ে রেখেই চলে ভাঙচুর। চেয়ার, টেবিল,এসি পর্যন্ত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন। অনুব্রতের পাঞ্জাবির কলারও ধরা হয়। টেবিলের কাচ ভেঙে ছিটকে এসে লাগে তাঁর গায়ে ও মুখে।
হামলার সময় আক্রমণকারীরা অনুব্রতকে উদ্দেশ করে বলতে থাকেন, গত ১৫ বছর ধরে তিনি বীরভূমের মানুষের ওপর অত্যাচার চালিয়েছেন। তাঁকে “গরুচোর” বলেও কটাক্ষ করা হয়। অনুব্রত কখনও চুপ করে থাকেন, কখনও হাত নেড়ে শান্ত হতে বলেন। পাল্টা তাঁকে গালিগালাজও শুনতে হয়। হামলাকারীদের একজন হুমকির সুরে বলেন, তাঁকে ঘর থেকে বেরোতে দেওয়া হবে না। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা গিয়েছে, ঘরে তখন অনুব্রতের সঙ্গীরা উপস্থিত থাকলেও তাঁরা দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, অনুব্রতকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন করা হচ্ছে। জবাবে তিনি বলেন, অভিষেক তাঁর নেতা নন, তাঁকে তিনি কখনও পছন্দ করেননি। হামলাকারীদের দাবি, তাঁরা সাধারণ মানুষ, তৃণমূল জমানায় অনুব্রতের হাতে নানাভাবে নিগৃহীত হয়েছেন। এক আক্রমণকারীর দাবি, অনুব্রত তাঁদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন।
৩০ মিনিট পরেই ওই দলীয় কার্যালয়ে পুলিশ পৌঁছয় এবং দুই হামলাকারীকে নিরস্ত্র করে। কার্যালয়ের বাইরে তাঁদের আরও কয়েকজন সঙ্গী ছিলেন। পুলিশের সামনেই তাঁরা প্রশ্ন তোলেন, এত অত্যাচারের পরেও কি অনুব্রতকে ছেড়ে দেওয়া হবে। পরে যুবকদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, তিন যুবকের নাম আকাশ দেবনাথ, বান্টি বীরবংশী ও ঋষভ গোর। তিনজনেরই বাড়ি সিউড়ির হাটজন বাজার এলাকায়। কিন্তু রাতেই তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ অনুব্রত বা তাঁর দলের পক্ষ থেকে স্থানীয় থানায় কোনও লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। পুলিশও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা রুজু করেনি। অথচ পার্টি অফিসে ভাঙচুরের ভিডিও ইতিমধ্যেই সোশ্য়াল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকাশ্যে এমন ঘটনার পরেও কেন মামলা হল না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিরোধীদের একাংশের প্রশ্ন, অভিযুক্তদের ছেড়ে দেওয়ার পেছনে কোনও রাজনৈতিক চাপ বা সমীকরণ কাজ করেছে কি না।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ওই তিন যুবক এলাকায় “ভালো ছেলে” হিসেবেই পরিচিত এবং সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। বান্টির বাবা অমিত রাজবংশী এলাকায় লন্ড্রির দোকান চালান। তিনি জানান, তাঁর ছেলে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। কেন সে এমন কাজ করল বা কোন ক্ষোভ থেকে করল, তা সে নিজেই বলতে পারবে। তাঁর পরিবার কোনও দিন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। আগের সরকারের আমলেও তাঁরা সব সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ও গণতান্ত্রিক তৃণমূলের নেতা, ঘটনার তীব্র নিন্দা করে হামলাকারীদের “বিজেপি-আশ্রিত দুষ্কৃতী” বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সরকার বদলের পর মুখ্যমন্ত্রী বারবার আইনের শাসনের কথা বললেও এই ঘটনা দেখাচ্ছে শাসকদল নিজের মতো করে আইন প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। অনুব্রত শুধু দলের নেতা নন, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদও, এই বলে তিনি জানিয়েছেন, তাঁরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। তবে দলের ভেতর থেকেই উঠেছে ভিন্ন সুর। বীরভূমের আরেক নেতা কাজল শেখ ঘটনাটিকে “সাজানো” বলে মন্তব্য করেছেন। যদিও অনুব্রতের সঙ্গে কাজলের সম্পর্ক যে মধুর নয়, তা সকলেরই জানা।
মমতা তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষও ঘটনার নিন্দা করেছেন। অনুব্রতের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, এমন ঘটনা সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা, দুয়ের পক্ষেই ক্ষতিকর। কটাক্ষের সুরে তিনি আরও বলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বিবৃতি আসবে যে হামলাকারীদের সঙ্গে দলের কোনও সম্পর্ক নেই। বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা পাল্টা বলেছেন, অনুব্রতদের হাতে যাঁরা অত্যাচারিত হয়েছেন, তাঁদের ক্ষোভই হয়তো এভাবে বেরিয়ে আসছে। তবে তিনি জানিয়েছেন, এমন ঘটনা কাম্য নয়। অত্যাচারিতদের আইনের ওপর ভরসা রাখার পরামর্শ দিয়ে তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন চলছে এবং এ ধরনের ঘটনা বরদাস্ত করা হবে না।
