বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

২২ জনের মৃত্যুদণ্ড! যোগীরাজ্যে নজিরবিহীন রায়ে শোরগোল ফেললেন বিচারক রবি কুমার দিবাকর

17 August, 2026 3:32 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

লখনউ: উত্তরপ্রদেশের বিচারবিভাগের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন রেকর্ড গড়লেন মোজাফ্ফরনগরের ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক রবি কুমার দিবাকর। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ১০টি পৃথক হত্যা ও অপহরণ মামলায় ২২ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের (Death Penalty) সর্বোচ্চ সাজা শোনালেন তিনি। বিচারক দিবাকরের এই কঠোর ও ক্ষিপ্র পদক্ষেপের ফলে একদিকে যেমন অপরাধীদের শিবিরে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক, অন্যদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ন্যায়বিচার পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে বারাণসীর বিখ্যাত জ্ঞানবাপী মসজিদ কমপ্লেক্সের ভিডিওগ্রাফি সমীক্ষার ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়ে প্রথম দেশজুড়ে চর্চায় এসেছিলেন এই বিচারক। লখনউয়ের বাসিন্দা, ৪৬ বছর বয়সী বিচারক রবি কুমার দিবাকর শিক্ষাগত দিক থেকে বি.কম এবং এলএলএম (LLM) ডিগ্রিধারী। ২০০৯ সালে আজমগড়ে অতিরিক্ত দেওয়ানি বিচারক হিসেবে তাঁর বিচারিক কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে সুলতানপুর ও অন্যান্য জেলায় দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের নভেম্বর মাস থেকে তিনি মোজাফ্ফরনগরে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।

চার মাসের রায়ের খতিয়ান: এক নজরে ২২ জনের মৃত্যুদণ্ড

গত চার মাসে একের পর এক বকেয়া এবং চাঞ্চল্যকর মামলায় বিচারক দিবাকরের এজলাস থেকে আসা ঐতিহাসিক রায়গুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১২ বছর আগের খুনে ৪ জনের ফাঁসি (১৩ আগস্ট):

২০১৪ সালের ১৪ জুলাই শামলি জেলায় পুরনো শত্রুতার জেরে পবন কুমার নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় দুষ্কৃতীরা। ঘটনাস্থলেই পবন নিহত হন এবং তাঁর ভাই অশোক কুমার গুরুতর আহত হন। এই দীর্ঘ ১২ বছর পুরনো মামলায় রামবীর, রাজীব, রাহুল এবং হরেন্দর কুমারকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ১.৭০ লক্ষ টাকা জরিমানার নির্দেশ দেন তিনি।

 ২৭ বছর পর কাঠের ব্যবসায়ীর হত্যার বিচার (১২ আগস্ট):

১৯৯৯ সালের ৯ ডিসেম্বর ৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপণের জন্য কাঠ ব্যবসায়ী সালিমকে অপহরণের পর গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে ঝুলে থাকা এই মামলায় অভিযুক্ত শাহনওয়াজকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসির আদেশ দেন বিচারক দিবাকর।

কৃষক হত্যা ও ডাকাতির চেষ্টা (১৭ জুলাই):

২০১১ সালের ২০ আগস্ট শামলি জেলায় বাইকে করে যাওয়ার সময় ডাকাত দলের মুখোমুখি হন কৃষক রাজ সিং ও তাঁর বন্ধু বিজেন্দ্র। বাধা দিলে রাজ সিংকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং বিজেন্দ্রকে বেঁধে আখ ক্ষেতে ফেলে দেওয়া হয়। ১৭ জুলাই এই মামলার চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

 পঞ্চায়েত নির্বাচনের শত্রুতা (৬ জুলাই):

২০১০ সালের ২৪ আগস্ট পঞ্চায়েত নির্বাচনের রেষারেষির জেরে রাজবীর সিং (৬০) নামে এক প্রাক্তন গ্রাম প্রধানকে গুলি করে খুন করা হয়। মামলায় অভিযুক্ত প্রাক্তন প্রধান প্রমোদ ও তাঁর সহযোগী সহদেবকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে বিচারক মন্তব্য করেন, ঘটনাটি ‘বিরল থেকে বিরলতম’ (Rarest of Rare) অপরাধের মধ্যে পড়ে।

অন-ডিউটি হোমগার্ড হত্যা (২ জুলাই):

২০২০ সালের ৪ জুন ডিউটিতে থাকা হোমগার্ড রতিরাম এক অভিযুক্তের হাত থেকে তার নিজের মাকে বাঁচাতে গেলে আক্রান্ত হন এবং তাঁকে খুন করা হয়। অন-ডিউটি হোমগার্ড হত্যার এই ঘটনাকেও ‘বিরল থেকে বিরলতম’ আখ্যা দিয়ে আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়।

 রাজেন্দ্র সাইনি হত্যাকাণ্ড (২০ জুন):

রাজেন্দ্র সাইনি খুনের মামলায় অভিযুক্ত গজেন্দ্র এবং রামকিরণ নামে দুই ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।

মা ও ৬ বছরের শিশুর জোড়া খুন (৩০ মে):

প্রায় ১৫ বছর আগের এক হাড়হিম করা জোড়া খুনের মামলায় রহিস (৫০) নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১১ সালের ৭ নভেম্বর রাজেশ দেবী (৩০) এবং তাঁর ৬ বছরের ছেলে হিমাংশুকে আখ ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে ইট দিয়ে থেঁতলে খুন করেছিল রহিস।

এক পরিবারের চার সদস্যের ফাঁসি (২৮ এপ্রিল):

২০১৯ সালের একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় এক নারী এবং তাঁর তিন ছেলেকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে ফাস্ট ট্র্যাক আদালত।

আইনজীবী অপহরণ ও খুন (৬ এপ্রিল):

২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর ৪৫ লক্ষ টাকার লেনদেন সংক্রান্ত বিবাদের জেরে আইনজীবী মোহাম্মদ সমীরকে অপহরণের পর খুন করে সিক্রি গ্রামের জঙ্গলে দেহ ফেলে দেওয়া হয়। এই মামলায় ৩ জন আসামিকে ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়।

‘বিরল থেকে বিরলতম’ অপরাধ এবং দ্রুত বিচার

বিচারক রবি কুমার দিবাকরের দেওয়া একাধিক রায়ে বারবার উঠে এসেছে আইনের সেই বিখ্যাত ‘বিরল থেকে বিরলতম’ (Rarest of Rare Cases) প্রসঙ্গ। তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করেছেন যে, সমাজের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধীদের কাছে কঠোর বার্তা পৌঁছানোর জন্য এই ধরণের জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তিই একমাত্র বিকল্প।

দশক পার হয়ে যাওয়া মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং এত অল্প সময়ে ২২ জন অপরাধীকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার ঘটনা ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের গুরুত্ব ও কার্যকারিতাকে নতুন করে প্রমাণ করল। বিচারক দিবাকরের এই ভূমিকা বর্তমানে গোটা দেশের আইনি মহলে প্রশংসিত হচ্ছে।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee