আজ ‘গণ্ডার দিবস’এ প্রশ্ন: আমরা কি ইয়োনেস্কোর নাটকের চরিত্র?
আজ বিশ্ব গণ্ডার দিবস। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এই প্রাণীটির অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। চোরাশিকার, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের সামনে গণ্ডারকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই তাই শুধু একটি প্রাণী সংরক্ষণের লড়াই নয়। এটি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইও।
কিন্তু গণ্ডার বলতেই আর একটি কথা মনে পড়ে। ফরাসি-রোমানিয়ান নাট্যকার ইউজিন ইয়োনেস্কোর বিখ্যাত নাটক ‘রাইনোসরাস’ বা ‘গণ্ডার’এর কথা। এটি একটি অ্যাবসার্ড ড্রামা। নাটকে দেখা যায় শহরে একের পর এক মানুষ গণ্ডারে পরিণত হয়ে যাচ্ছ। প্রথমে ঘটনাটি অদ্ভুত মনে হয়। কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ আতঙ্কিত হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে অস্বাভাবিক ঘটনাটিই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন দাঁড়ায়, গণ্ডারে পরিণত হওয়া কি কেবল অন্যদের সমস্যা, নাকি সমাজের প্রত্যেক মানুষের সামনে ঘুরে দাঁড়ানোটাই একটা পরীক্ষা?
ইয়োনেস্কোর নাটককে শুধু একটি কাল্পনিক গল্প হিসেবে পড়লে তার গভীরতাটা ধরা পড়ে না। সেখানে গণ্ডার আসলে একটি প্রতীক। গণ-উন্মাদনা, অন্ধ অনুসরণ, ব্যক্তিসত্তার বিলুপ্তি এবং অন্যায়ের সামনে মানুষের আত্মসমর্পণের প্রতীক এই নাটকটি।
আর সেখানেই আজকের পৃথিবীর সঙ্গে তার অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আমাদের বাংলা ভাষায় ‘গণ্ডারের চামড়া’ বলে একটি প্রবাদ আছে। এর অর্থ এমন মোটা চামড়া, যার কাছে লজ্জা, সমালোচনা, অপমান কিংবা নৈতিক প্রশ্ন কোনও কিছুই পৌঁছায় না। কথাটা কেবল ব্যক্তিকে বোঝায় না। তা একটি সামাজিক মানসিকতাকেও বোঝায়।
তাই এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমরা কি ধীরে ধীরে সেই মোটা চামড়ার সমাজ তৈরি করছি? অন্যায় দেখছি, কিন্তু প্রতিবাদ করছি না। অসভ্যতা দেখছি, কিন্তু মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি। মিথ্যা শুনছি, কিন্তু প্রশ্ন করছি না। ভুল দেখছি, কিন্তু ভুল বলার সাহস হারাচ্ছি। যে কথাকে গতকালও আমরা অস্বীকার করেছি, আজ সেটিকেই আমরা দিব্য মেনে নিয়েছি। কাল যেটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি, আজ তার সঙ্গেই মানিয়ে নিচ্ছি, বাহবা দিচ্ছি।
একটি সমাজ কেবল তখনই অসুস্থ হয় না, যখন সেখানে অন্যায় ঘটে। সমাজ তখনও অসুস্থ হয়, যখন অন্যায়কে অন্যায় বলার মানুষ কমে যায়। সমালোচনা মানেই বিরোধিতা নয়। প্রতিবাদ মানেই শত্রুতা নয়। প্রশ্ন মানেই বিদ্রোহ নয়। বরং প্রশ্ন করার ক্ষমতাই একটি সুস্থ সমাজের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। যে সমাজে প্রশ্ন নেই, সেখানে ধীরে ধীরে বিবেকও নিস্তেজ হয়ে যায়। আজ আমাদের চারপাশে যেন সেই নিস্তেজতার ছায়া।
‘হুজুর যা আজ্ঞা করবেন’— এই মানসিকতা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য বিপজ্জনক। নেতা, প্রতিষ্ঠান, জনপ্রিয়তা, সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য যদি আমাদের বিচারবোধকে গ্রাস করে, তাহলে আমরা আর স্বাধীন মানুষ থাকি না। তখন আমরা নিজের চোখে দেখা জিনিসকেও অন্যের চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করি। ইয়োনেস্কোর গণ্ডাররা হয়তো আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
গণ্ডার হওয়া মানে শুধু চামড়া মোটা হওয়া নয়। গণ্ডার হয়ে যাওয়া মানে নিজের স্বর হারিয়ে ফেলা। চারপাশের সবাই যেদিকে যাচ্ছে, প্রশ্ন না করে সেই দিকেই হাঁটা। নিজের বিবেককে ধীরে ধীরে নিশ্চুপ করে দেওয়া। কিন্তু মানুষ হওয়ার অর্থই তো অন্যরকম। মানুষ প্রশ্ন করে। মানুষ দ্বিমত পোষণ করে। মানুষ অন্যায়ের সামনে দাঁড়ায়। মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করে। মানুষ সৌন্দর্য, সংস্কৃতি, ভদ্রতা ও মানবিকতার মূল্য বোঝে। সবচেয়ে বড় কথা হল, মানুষ নিজের বিবেককে অন্যের হাতে সম্পূর্ণ তুলে দেয় না। তাই আজ গণ্ডার দিবসে গণ্ডারকে বাঁচানোর পাশাপাশি নিজেদের দিকেও একবার তাকানো দরকার।
বনের গণ্ডারকে চোরাশিকারির হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। আর মানুষের ভিতরের ‘গণ্ডার’কে প্রতিরোধ করতে হবে। কারণ পৃথিবীতে গণ্ডার থাকা দরকার। কিন্তু মানুষের সমাজে মানুষের চামড়া যেন এতটা মোটা না হয়ে যায় যেখানে সত্য, অন্যায়, লজ্জা, সৌন্দর্য কিংবা প্রতিবাদের কোনও অনুভূতিই থাকবে না। ইয়োনেস্কোর নাটকের প্রধান চরিত্র বেরেঞ্জার একা হয়ে গেলেও লড়াই থেকে সরে আসেননি। মানুষ হিসাবে নিজের সত্তা ও বিবেককে জাগিয়ে রাখতে সে লড়াই চালিয়ে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত মনে পড়ে যায় নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘মেবার পতন’ নাটকের একটি গানের চিরন্তন লাইনটির কথা।‘আবার তোরা মানুষ হ।’ আজ গণ্ডার দিবসে এটাই আমাদের সবচেয়ে জরুরি আত্মজিজ্ঞাসা হয়ে উঠুক!
