বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

যাঁরা ভূত খুঁজে বেড়ান (প্রথম পর্ব)

22 September, 2026 4:11 PM Sandipan Saha
শেয়ার করুন

সন্দীপন বিশ্বাস

রাত তখন দুটো। একটি পুরোনো বাড়ির দোতলার ঘরে তিনজন মানুষ নিঃশব্দে বসে আছেন। জরাজীর্ণ বাড়ির চারিদিক থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। দেওয়ালের ফাটল বেয়ে বেরিয়ে এসেছে গাছের শিকড়। কিন্তু সেসব দেখার উপায় নেই। কেননা ঘরের আলো নেভানো। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঘরে একটা চামসি গন্ধ! সামনে ধূলিমলিন টেবিলে রাখা আছে একটি টেপ রেকর্ডার, একটি তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র আর একটি চৌম্বকক্ষেত্র নির্ণায়ক। তিনজন যেন কারও অপেক্ষা করছে। মধ্যরাতের ছায়াময় এক অতিথি। এই অন্ধকারের মধ্যে সে ছায়া হয়ে দেখা দেবে। হঠাৎ একজন হাত তুলে সবাইকে থামান, কারণ চুম্বকের কাঁটা নড়ে উঠেছে। দেখা গেল, তাপমাত্রা নেমে গেছে কয়েক ডিগ্রি। অথচ জানালা বন্ধ। সে কি তবে এল?

তিনজন তাকিয়ে বন্ধ দরজার দিকে। ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হল। দরজা খোলার শব্দ। বহুদিনের মরচে পড়া কবজার শব্দ। কিন্তু কে খুলল? শব্দের পিছনেই যেন একটা ছায়া! সত্যিই কি, নাকি চোখের ভুল? ক্যামেরা ও রেকর্ডার চালু হল।

দরজার ওপাশের বারান্দায় কার যেন পায়ের শব্দ। মেয়েদের মতো নরম পায়ের শব্দ! আবার সব চুপচাপ। আবার শব্দ। এবারে বেশ জোরে। ঠক! সবাই দম বন্ধ করে পরবর্তী প্রহরের অপেক্ষা করছে। আবার শব্দ ঠক… ঠক…!

আবার সব চুপচাপ। একজন ফিসফিস করে বলল, ‘কেউ আছেন?’

কোনও উত্তর নেই।

আবার প্রশ্ন— ‘আপনি কি এখানে আছেন?’

নিঃশব্দ চারধার। একটা ঠান্ডা হাওয়া। তারপরই হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় কোথায় যেন একটা কী ভেঙে পড়ল!

এই পর্যন্ত পড়ে অনেকের হাত-পায়ের রোম নিশ্চয় খাড়া হয়ে উঠেছে। এই দৃশ্য কল্পনার হলেও, ভূতের সন্ধানে নামা মানুষদের জীবন ঠিক এই ধরনের মুহূর্ত দিয়েই গড়া।

এই যে ভূত খোঁজার চেষ্টা যাঁরা করেন, তাঁদের বলা হয় paranormal investigator। তাঁদের কেউ কেউ অবশ্য নিজেদের ‘ghost hunter’ বলেন। কেউ বলেন ‘paranormal researcher’।

তবে বলে রাখা দরকার যে, এখানেই বিজ্ঞান আর বিশ্বাসের সীমারেখা এসে দাঁড়ায়। কেননা একটি অজানা শব্দ পাওয়া মানেই সেটি মৃত মানুষের—এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে করা যায় না। কিন্তু বারবার প্রশ্ন উঠে আসে, কেন মানুষ এই কাজ করে? আসলে হাজার বছর ধরে মানুষ মৃত্যুর পরের জীবন, আত্মা এবং অদৃশ্য জগতের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করেছে।

একেবারে গোড়ার দিকে কাজটা মোটেই রোমাঞ্চের ছিল না। ১৮৮২ সালে লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত হয় সোসাইটি ফর সাইকিক্যাল রিসার্চ। হেনরি সিজউইক, ফ্রেডরিক মায়ার্স, এডমন্ড গার্নির মতো গবেষকরা অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতার বিবরণ সংগ্রহ করতে শুরু করেন। তাঁদের প্রশ্ন ছিল একটাই। মানুষ যে ভূত দেখেছে বলে দাবি করে, তার পেছনে কি সত্যিই কিছু আছে? তাঁরা হাজার হাজার মানুষের সাক্ষ্য জোগাড় করেছিলেন। উদ্দেশ্য ভূত প্রমাণ করা নয়, যাচাই করা।

এই যাচাইয়ের ইতিহাস আরও পুরনো। ১৭৬২ সালে লন্ডনের কক লেনের এক বাড়িতে ‘আঁচড়ানো ফ্যানি’ নামে এক অশরীরীর কথা রটে। দেয়ালে আঁচড়ের শব্দ হতো, আর প্রশ্নের উত্তরে আত্মা নাকি টোকা দিয়ে সাড়া দিত। স্বয়ং ডঃ স্যামুয়েল জনসন সেই তদন্তে যোগ দেন। তদন্তকারীরা গির্জার নীচের কবরঘরে গিয়ে অপেক্ষা করেছিলেন, কিন্তু সেই ‘ভৌতিক’ শব্দ আর হয়নি। শেষ পর্যন্ত জালিয়াতি ধরা পড়ে। অর্থাৎ ভূতের তদন্তকারীদের মধ্যে সংশয়ী মানুষের ধারাও শুরু থেকেই ছিল।

এই ধারায় সবচেয়ে বিখ্যাত তদন্তকারী সম্ভবত হ্যারি প্রাইস। ১৯২৫ সালে তিনি লন্ডনে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি অফ সাইকিক্যাল রিসার্চ স্থাপন করেন। তাঁর সবচেয়ে আলোচিত অভিযান এসেক্সের বর্লি রেক্টরিতে। ১৮৬২ সালে তৈরি এই পাদ্রীভবন নিয়ে গল্পের শেষ ছিল না। এক পেত্নি-সন্ন্যাসিনী নাকি গভীর রাতে বাগানের পথে হেঁটে বেড়ান। এক ভূতুড়ে ঘোড়ার গাড়ির শব্দ শোনা যায়। ১৯৩০-এর দশকে সেখানে বসবাসকারী ফয়স্টার পরিবার দাবি করেছিল, দেয়ালে আপনা থেকে হাতের লেখা ফুটে ওঠে, আর সেই লেখায় সাহায্য চাওয়া হয়েছে। ১৯৩৯ সালে আগুনে বাড়িটি পুড়ে যায়।

এই ধরনের কাহিনিতে মূলত সত্য ও কল্পনা মিশে যায়। এখানে তথ্য আর কিংবদন্তিকে আলাদা করা প্রয়োজন। সন্ন্যাসিনীর কাহিনি, অর্থাৎ প্রেমের অপরাধে তাঁকে দেয়ালে গেঁথে ফেলা হয়েছিল। এর কোনও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। এগুলো লোকমুখে প্রচারিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে একদল তদন্তকারী প্রাইসের পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত ছিল, বহু ঘটনা বাড়িয়ে বলা হয়েছিল, কিছু হয়তো সাজানোও। ফলে বর্লি এখন একই সঙ্গে ভূতের গল্প এবং কাল্পনিক ভূতের গল্প।

আধুনিক অনুসন্ধানীরা সঙ্গে রাখেন তাপমান মাপার যন্ত্র, ক্যামেরা, চৌম্বকক্ষেত্র মাপার যন্ত্র এবং রেকর্ডার। শূন্য ঘরে রেকর্ডার চালিয়ে রেখে পরে সেই রেকর্ডিং শোনা হয়। অনেকে দাবি করেন, ফাঁকা জায়গায় ফিসফিস করে কেউ কথা বলেছে, কখনও নাম ধরে ডেকেছে। এটি ‘ইলেকট্রনিক ভয়েস ফেনোমেনা’ নামে পরিচিত। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের মস্তিষ্ক এলোমেলো শব্দের মধ্যেও পরিচিত ধরন খুঁজে নিতে অভ্যস্ত, ফলে অস্পষ্ট আওয়াজে মানুষের কণ্ঠ শোনা অস্বাভাবিক নয়। তবু নির্জন রাতে হেডফোনে নিজের নাম শুনে যাঁর গায়ে কাঁটা দেয়নি, তিনি হয়তো সত্যিই সাহসী।

এর চেয়েও অস্বস্তিকর একটি ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯০-এর দশকে, কভেন্ট্রির এক গবেষণাগারে। প্রকৌশলী ভিক ট্যান্ডি সেখানে রাতে একা কাজ করতেন। তাঁর মনে হতো ঘরে কেউ আছে, গা শিরশির করত, আর একবার চোখের কোণে ধূসর একটি ছায়ামূর্তি দেখে তিনি চমকে উঠেছিলেন। পরদিন তিনি লক্ষ্য করেন, দেয়ালে আটকানো একটি তলোয়ারের ফলা অকারণে কাঁপছে। অনুসন্ধানে ধরা পড়ল, একটি বায়ুচালক যন্ত্র থেকে প্রায় ১৯ হার্জ কম্পাঙ্কের একটি অশ্রাব্য তরঙ্গ ঘরে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। যন্ত্র বন্ধ করতেই অনুভূতিগুলোও মিলিয়ে গেল। পরে এ নিয়ে তিনি একটি গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেন। ভয়টা ছিল সত্যি, কিন্তু কারণটা ভূত নয়। তবে এটি সব ভূতুড়ে অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা দেয় না, দেয় কেবল কিছু অভিজ্ঞতার।

আমাদের দেশেও এমন জায়গার অভাব নেই। রাজস্থানের ভানগড় দুর্গের প্রবেশপথে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ সূর্যাস্তের পর থেকে সূর্যোদয়ের আগে পর্যন্ত ভেতরে ঢোকা নিষিদ্ধ করে ফলক লাগিয়েছে। অবশ্য নিষেধাজ্ঞার সরকারি কারণ নিয়ে মতভেদ আছে। ভয়ের গল্প যত ছড়ায়, নিষেধাজ্ঞা নিয়ে গল্পও তত বাড়ে।

ভূত-অনুসন্ধানীদের মধ্যে কেউ বিশ্বাসী, কেউ সংশয়ী। অনেকে দশকের পর দশক রাত জেগেও কিছুই দেখেননি। যাঁরা কিছু দেখেছেন বলে দাবি করেন, তাঁদের প্রায় কারও দাবিই বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষায় দাঁড়ায়নি। তবু তাঁদের অভিজ্ঞতার একটি অংশ অস্বীকার করা কঠিন। অন্ধকার ঘরে একা, নিস্তব্ধতার মধ্যে মানুষের ভয় পাওয়াটা সত্যি। হঠাৎই আমাদের গা-ছমছম করে ওঠে! ভূত নেই বা আছে— তা নিয়ে আজীবন তর্ক করা যেতে পারে। তা বলে ভয় পাওয়াটাও মিথ্যা হয়ে যায় না। তাই যাঁরা ভূত খোঁজেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা কেমন? পড়তে থাকুন কয়েকটি অধ্যায়ে।

(চলবে)

 

প্রতিবেদন

Sandipan Saha