এ কেমন উচ্চশিক্ষা, যা মেধাবী ছাত্রদের ঠেলে দেয় হতাশার দিকে?
আবার একটি আইআইটি ক্যাম্পাসে এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। তার এই পরিণতিতে একই প্রশ্ন পুনরায় ফিরে এসেছে। কতটা চাপ একজন মেধাবী ছাত্রকে এমন এক চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে? আর কতগুলি মৃত্যু হলে আমরা সত্যিই নড়েচড়ে বসব? কেন এখনও আমরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখব না?
আইআইটি বম্বের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাহিল ওয়াকোড়েকে পরীক্ষা শেষের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হস্টেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের অভিযোগকে ঘিরে ঘটনার সূত্রপাত। কিন্তু মৃত্যুর পর বিষয়টি আরও গুরুতর প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়েছে। সাহিলের বাবা অভিযোগ করেছেন, তাঁর ছেলে কয়েক মাস ধরে জাতিবৈষম্য সংক্রান্ত বিষয়ে অপমান ও মানসিক হয়রানির শিকার হচ্ছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেছে এবং তফসিলি জাতি-উপজাতি অত্যাচার প্রতিরোধ আইনের ধারাও এখানে যুক্ত হয়েছে। তদন্তভার মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে গিয়েছে।
অন্যদিকে আইআইটি বম্বে কর্তৃপক্ষ জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগটি অস্বীকার করেছে এবং জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে। ফলে বলা যায়, অভিযোগ গুরুতর, কিন্তু অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন তদন্তের। কিন্তু তদন্তের ফল যাই হোক, বৃহত্তর প্রশ্নটি আমাদের এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
আজ আমাদের ভাবতেই হবে! একজন ছাত্র আইআইটিতে পৌঁছান কীভাবে? বছরের পর বছর পড়াশোনা, প্রতিযোগিতা, অসংখ্য রাত জেগে প্রস্তুতি, প্রবল আর্থিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে যে ছাত্র দেশের অন্যতম কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইআইটিতে পৌঁছান, তিনি শুধু একটি রোল নম্বর নন। তিনি একটি পরিবারের স্বপ্ন। রাষ্ট্রের বিনিয়োগ। দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ।
সাহিলও ছিলেন মেধাবী ছাত্র। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, তাঁর প্রথম বর্ষে কোনও ব্যাকলগ ছিল না এবং পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি খেলাধুলোতেও যুক্ত ছিলেন। ভবিষ্যতে সিভিল সার্ভিসে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তাঁর। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কি শুধুই মেধা যাচাইয়ের জায়গা, নাকি মানুষ তৈরি করার জায়গাও? পরীক্ষায় অনিয়ম হয়ে থাকলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা হতেই পারে। কোনও প্রতিষ্ঠানই নিয়ম ভাঙাকে প্রশ্রয় দিতে পারে না। কিন্তু শৃঙ্খলা এবং অপমান এক জিনিস নয়। প্রশাসনিক কঠোরতা এবং মানবিকতার অভাবও এক জিনিস নয়। একটি ভুলের জন্য একজন ছাত্রকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া। এই দুইয়ের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।
আর যদি সাহিলের পরিবারের জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে সেটি শুধু একজন ছাত্রের প্রতি অন্যায় নয়। সেটি ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক গভীর ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠবে। কারণ সংবিধান নাগরিকের সমতার কথা বলেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও সেই সমাজের বাইরে নয়। আইআইটির মতো প্রতিষ্ঠানে একজন ছাত্রের পরিচয় হওয়ার কথা তাঁর মেধা, পরিশ্রম ও চরিত্র দিয়ে, তাঁর জাত দিয়ে নয়।
আজও আমাদের সমাজের মধ্যে রয়েছে মানসিকভাবে পিছুটান। কারণ জাতপাত কেবল গ্রামবাংলার কোনও পুরনো সামাজিক সমস্যা নয়। এটি যদি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার বা দেশের সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ভিতরেও কোনওভাবে জায়গা করে নেয়, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি শুধু প্রতিষ্ঠানগত নয়, সমস্যাটির অবস্থান আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বের গভীরে। জাতিবৈষম্যকে আইন দিয়ে নিষিদ্ধ করা যায়। কিন্তু মানুষের মাথার ভিতর থেকে মুছে ফেলতে হলে শিক্ষা, প্রশাসন এবং সামাজিক সংস্কারের দীর্ঘ প্রক্রিয়া প্রয়োজন। আর সেই কাজটি শুরু করার সময় কিন্তু পেরিয়ে যাচ্ছে। এরপর কিন্তু আমরা এইসব উন্মার্গগামিতাকে ঠেকাতে পারব না।
আইআইটি বম্বেতে এই বছর এটি তৃতীয় আত্মহত্যার ঘটনা বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মৃত্যুকে পরিসংখ্যান বানিয়ে ফেলা বিপজ্জনক। তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম এই সংখ্যাগুলি আসলে একেকটি পরিবার, একেকটি অসমাপ্ত জীবন, একেকটি অপূর্ণ ভবিষ্যৎ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তাই নতুন করে ভাবতে হবে। শিক্ষার্থীর মানসিক নিরাপত্তা কি শিক্ষারই অংশ নয়?
প্রতিটি বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন ও কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজন। জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। শিক্ষক ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের জন্য সংবেদনশীলতার প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। ছাত্রদের জন্য এমন কাউন্সেলিং ব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে তাঁরা প্রতিষ্ঠানের প্রতিশোধ বা অপমানের ভয় ছাড়াই কথা বলতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা, কোনও ছাত্র সমস্যায় পড়লে তাঁকে প্রথমে ‘অপরাধী’ হিসেবে দেখার বদলে একজন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। মেধার কোনও জাত হয় না। প্রতিভার কোনও বর্ণ হয় না। আইআইটি সিটে বসা ছাত্রটি শুধু নিজের পরিবারের নন, তিনি দেশেরও সম্পদ। তাঁর ভুল হলে শাস্তি হতে পারে। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত হতে পারে। কিন্তু তাঁকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া যাবে না, যেখানে জীবনের চেয়ে ব্যর্থতা বড় হয়ে ওঠে। তাঁকে যেন আমরা জীবনের চরমততম কোনও সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে না দিই।
উচ্চশিক্ষার নামে যদি একজন তরুণের জীবন হারিয়ে যায়, তবে মানতে হবে, সেই শিক্ষার মধ্যে গলদ আছে। সাহিলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তেই নির্ধারিত হবে। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, দায় কার—সেটিও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া দরকার। কিন্তু তদন্তের ফলের অপেক্ষায় থেকে আমরা যদি বৃহত্তর প্রশ্নটিকে ভুলে যাই, তাহলে আর একটি মৃত্যুর পর আবার একই প্রশ্ন উঠবে। আর তখন হয়তো আরও একটি পরিবার এমনভাবে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলবে,“আমাদের সন্তানকে আমরা পড়তে পাঠিয়েছিলাম। ফিরে পেলাম তার নিথর শরীর।”
সুতরাং এই ব্যবস্থাকে বদলাতে হবে। কারণ শিক্ষা কোনও ছাত্রকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার ব্যবস্থা নয়। শিক্ষার অর্থ মানুষের সামনে জীবনের নতুন নতুন দরজা খুলে দেওয়া। তাই আমাদের ভুলগুলো অবিলম্বে শুধরে নিতে হবে।
