কীভাবে অ্যাকাউন্টে ৭ কোটি, শালবনি জমি কেলেঙ্কারিতে সুমিতের বয়ানে অভিষেকের নাম
সংবাদদাতা, মেদিনীপুর: শালবনি জমি কেলেঙ্কারিতে এবার সরাসরি নাম জড়াল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। জমি জালিয়াতির টাকা তৃণমূলের অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে, এই তথ্য আগেই আদালতে জানিয়েছিল সিআইডি। সেই সূত্রেই অভিষেকের আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়ের বয়ানে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের নাম উঠে এসেছে বলে দাবি রাজ্য গোয়েন্দা দপ্তরের। সরকারি জমির ভুয়ো নথি তৈরি করে বিক্রির অভিযোগে এই মামলায় ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন সুমিত রায়, প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরা এবং তাঁর কয়েকজন শাগরেদ।
শনিবার সিআইডি হেফাজতে থাকা সুমিতকে মেদিনীপুর আদালতে হাজির করানো হয়। সূত্রের খবর, সেখানে সিআইডির পেশ করা নথিতে বলা হয়েছে, জেরায় সুমিত জানিয়েছেন, অভিষেকের নির্দেশে সাংসদের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে পরিচিত ‘টি ঘোষ’ নামে এক ব্যক্তি তাঁকে টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা তৃণমূলের দলীয় তহবিলে জমা করার জন্যই দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তা ব্যাঙ্কে জমা করেছেন বলে দাবি সুমিতের।সুমিতের আরও দাবি, জমি জালিয়াতির কোনও টাকা তিনি পাননি। তবে দলের নির্দেশে বেশ কয়েকবার শালবনি গিয়েছিলেন। আদালতে এমনটাই দাবি সিআইডির।
আরও পড়ুন: মমতার কথায় রেজিনগরে ভোটের লড়াইয়ে রবিউল, সরে দাঁড়াবেন না
চার্জশিটে ৭ কোটির হিসাব
চলতি মাসের গোড়ায় সুজয়ের বিরুদ্ধে জমা দেওয়া চার্জশিটে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট নম্বর উল্লেখ করে সিআইডি জানায়, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ওই অ্যাকাউন্টে দফায় দফায় প্রায় ৭ কোটি টাকা জমা করেছিলেন সুমিত। এই সংক্রান্ত নথিও চার্জশিটের সঙ্গে আদালতে জমা দেওয়া হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোড শাখার ওই অ্যাকাউন্টটি পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল যুব কংগ্রেসের নামে নথিভুক্ত। সেখানে কেন এত টাকা জমা করা হয়েছিল, প্রশ্ন করতেই সুমিত জানান, সাংসদ অভিষেকের নির্দেশে ‘পার্টি ফান্ডে’ জমা করেছিলেন তিনি, আর টাকা দিয়েছিলেন ‘টি ঘোষ’। সিআইডি শনিবার আদালতে এ কথা জানিয়েছে।
সিআইডি আধিকারিকদের দাবি, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যেই শালবনির এই জমি জালিয়াতি হয়েছিল। সুজয়ের বিরুদ্ধে দেওয়া চার্জশিটে অভিষেকের দুই দেহরক্ষী ও সুজয়ের গাড়িচালকদের বয়ানকে হাতিয়ার করেছে সিআইডি। ওই সাক্ষীরা নাকি সুজয়ের সঙ্গে সুমিতের টাকার লেনদেন দেখেছেন। তাঁদের বক্তব্য, সুজয় কলকাতায় সুমিতের অফিসে এসে টাকা দিয়ে গিয়েছেন। সিআইডির দাবি, সুমিতের নিজস্ব কোনও অফিস নেই। হয় ক্যামাক স্ট্রিট, নয় কালীঘাটে সাংসদ অভিষেকের কার্যালয়ই তাঁর অফিস হিসেবে পরিচিত।
আরও পড়ুন: খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের হানা, পুরীতে ফেলা হল ৪ কুইন্টাল খাজা
তদন্তকারীদের দাবি, সাত কোটির ওই লেনদেনের দায় পুরোটাই সাংসদের ঘাড়ে চাপিয়েছেন সুমিত। তবে সেই বয়ান কতটা সঠিক, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এক সিআইডি আধিকারিকের কথায়, নিজের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা না দিয়ে সুমিত যখন পার্টির অ্যাকাউন্টে জমা করেছেন, সেটা তাঁর একার সিদ্ধান্ত হতে পারে না। সেই কারণেই সুমিতের উল্লিখিত ‘টি ঘোষ’-এর বয়ান রেকর্ড করতে চলেছেন সিআইডি আধিকারিকেরা। সূত্রের খবর, ওই টাকার উৎস জানাতে পারেননি সুমিত। তাঁর বয়ান সঠিক প্রমাণিত হলে টাকার উৎস জানতে এই মামলায় অভিষেককেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তদন্তকারীরা।
শনিবার সুমিত ছাড়াও এই মামলায় ধৃত লক্ষ্মী ভুঁইয়া, নিত্য রায় ও অমিত ঘোষকে আদালতে তোলা হয়। সরকারি আইনজীবী সৈয়দ নাজিম হাবিব তদন্তের অগ্রগতির কথা জানিয়ে সুমিত-সহ বাকিদের ফের জেরা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। সাত দিনের সিআইডি হেফাজতের আবেদন জানানো হয়। সুমিতের আইনজীবী প্রথমে জামিনের আবেদন করলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেন। শেষ পর্যন্ত আদালত সুমিত-সহ ধৃতদের পাঁচ দিনের সিআইডি হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছে। সিআইডি জানিয়েছে, ধৃতদের কাছ থেকে পাঁচটি মোবাইল-সহ একাধিক নথি উদ্ধার হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর ফের তাঁদের আদালতে হাজির করানো হবে।
