বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

রাজা সেন: চলচ্চিত্রের এক স্বতন্ত্র কারিগর

16 August, 2026 5:05 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

সন্দীপন বিশ্বাস : বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কিছু পরিচালক আছেন, যাঁদের সাফল্য শুধু তাঁদের তৈরি ছবির সংখ্যায় মাপা যায় না। কেননা তাঁরা কোয়ান্টিটি নয়, বিশ্বাস করেন কোয়ালিটিতে। গল্পের ভিতর দিয়ে, ফ্রেমের ভিতর দিয়ে তাঁরা মানুষের জীবন ও তার আত্মাকে ধরার চেষ্টা করেছেন। প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে তাঁরা তৈরি করেন একটি নিজস্ব ভাষা। রাজা সেন সেই ধারারই পরিচালক। শিল্প-সংস্কৃতির এমন অবক্ষয়ের কালে তাঁর চলে যাওয়া এক বড় ক্ষতি।

দিনের পর দিন প্রায় নিঃশব্দে একের পর এক ভালো কাজ করে গিয়েছেন রাজা। সেভাবে কোনওদিন মিডিয়ার গা ঘেঁষাঘেঁষি করেননি। তাই সম্ভবত যে প্রচার তাঁর পাওয়া উচিত ছিল, সেটা পাননি।

রাজা সেনের পরিচালক-সত্তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর স্বাতন্ত্র্য। তিনি কখনও নিজেকে কোনও নির্দিষ্ট ছকের মধ্যে আটকে রাখেননি। টেলিভিশন থেকে তথ্যচিত্র, টেলিফিল্ম থেকে পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র— প্রতিটি মাধ্যমে তিনি নিজের মতো করে গল্প বলার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে একদিকে যেমন ছিল সাহিত্যের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা, তেমনই অন্যদিকে ছিল বাস্তব জীবনের প্রতি তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ।
তাঁর ছবির কথা বললে প্রথমেই বলতে হয় ‘দামু’র কথা। ছবিটি জাতীয় পুরস্কার পায় শ্রেষ্ঠ শিশু চলচ্চিত্র হিসেবে। কিন্তু ‘দামু’-কে শুধু শিশুদের ছবি বললে যথার্থ মূল্যায়ন করা হয় না। কারণ তাঁর ছবিতে শিশু মানে শুধু শিশুচরিত্র নয়। শিশুর চোখ দিয়ে তিনি সমাজকে দেখার চেষ্টা করেছেন।

এরপর ‘আত্মীয়-স্বজন’, ‘দেশ’, ‘দেবীপক্ষ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘ল্যাবরেটরি’, ‘মায়া মৃদঙ্গ’ প্রভৃতি ছবিতে তিনি বারবার নিজের পরিসর বদলেছেন। বারবার নিজেকে ভেঙে নতুন আঙ্গিক তৈরি করতে প্রয়াসী হয়েছেন। সাহিত্য, সম্পর্ক, সামাজিক বাস্তবতা, মানুষের অন্তর্লোক কিংবা শিল্পের ক্রমাবলুপ্তি নিয়ে কাতর হয়েছেন। তাঁর ক্যামেরা ঘুরেছে এক বিষয় থেকে আর এক বিষয়ে। তাঁর ছবিতে তাই তথাকথিত ‘ফর্মুলা’ খুঁজে পাওয়া কঠিন।

ছোট পর্দায় তাঁর ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ বা ‘সুবর্ণলতা’ কিংবা ‘আরোগ্য নিকেতন’এর মতো কাজ তিরিশ-চল্লিশ বছর পরেও মানুষ মনে রেখেছেন। আজও ছোট পর্দার সিরিয়াল দেখতে দেখতে একটু পুরনো মানুষরা বলেন, ‘ধুর যতসব অখাদ্য। কেন যে ‘সুবর্ণলতা’ বা ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’এর মতো সিরিয়াল তৈরি হয় না।’ এখানেই বোধহয় জিতে গিয়েছেন রাজা।

তাঁর কাজ দেখে আমার মনে হয়েছে, রাজা সেনের সিনেমা শুধু গল্প বলার মাধ্যম নয়। তার মধ্য দিয়ে তিনি সমাজ, মানুষ, চরিত্র, রাজনৈতিক পরিসর, সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতের ভঙ্গুর স্তরগুলিকে খুঁজে বের করেন। চরিত্রগুলি প্রত্যেকে নিজেদের জীবন, সংকট ও সম্পর্কের ভিতর দিয়ে সময়কে প্রকাশ করে। ক্যামেরা হাতে তিনি যেন সমাজ ও মানুষের ব্যবচ্ছেদ করেছেন।

তথ্যচিত্রের ক্ষেত্রেও একই পথের পথিক তিনি। তাঁর কাছে তথ্যচিত্র ছিল একজন মানুষ, একটি সংস্কৃতি, একটি শহর কিংবা সময়ের জীবন্ত দলিল। ‘ইতিহাসের কলকাতা’-র মতো কাজ থেকে শুরু করে ‘সুচিত্রা মিত্র’, ‘শম্ভু মিত্র’, ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়’, ‘জ্যোতির্ময়ী দেবী’ সহ বাংলার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে তিনি ক্যামেরায় ধরে রেখেছেন। একজন শিল্পী চলে গেলে তাঁর অভিনয়, গান, লেখা বা ছবি হয়তো থেকে যায়; কিন্তু তাঁর সময়ের মানুষটি, তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর স্মৃতি, তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অনেকটাই হারিয়ে যেতে পারে। রাজা সেন তাঁর তথ্যচিত্রের মাধ্যমে সেই হারিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে যেন একটি দীর্ঘ লড়াই চালিয়েছেন।

সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে তাঁর তথ্যচিত্র জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল ১৯৯৩ সালে। ‘আলকাপ’-এর মতো তথ্যচিত্রে তিনি শুধু একটি লোকসংস্কৃতিকে ক্যামেরাবন্দি করেননি, তার ভিতরের সংকট, পরিবর্তন এবং বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকেও ধরতে চেয়েছিলেন।
রাজা সেনের চলচ্চিত্র-চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাহিত্য। আশাপূর্ণা দেবী থেকে শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর থেকে রবীন্দ্রনাথ—সাহিত্যের চরিত্র ও জগৎকে পর্দায় আনার সময় তিনি কেবল গল্পটির দৃশ্যরূপ তৈরি করতে চাননি; চেষ্টা করেছেন তার অন্তর্গত মানবিকতাকে ধরে রাখতে। রাজা সেন চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর ক্যামেরায় বন্দি চরিত্রগুলি, তাঁর দেখা কলকাতা, তাঁর শিল্পসৃষ্টি —সব রয়ে গেল। রাজা সেন থাকবেন একজন স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রকার হিসেবে। বাংলা ছবির দর্শকরা তাঁকে সেই শ্রদ্ধায় মনে রাখবেন।

রাজার মৃত্যু নেই।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee