ময়না কাঠ পুজো দিয়ে শুরু কোচবিহারের ঐতিহ্যবাহী বড়দেবীর প্রতিমা নির্মাণ
সংবাদদাতা, কোচবিহার: রাধাষ্টমীর পুণ্য তিথিতে প্রাচীন রীতি ও শাস্ত্রীয় বিধান মেনে কোচবিহারের ঐতিহ্যবাহী বড়দেবী মন্দিরে সম্পন্ন হল ময়না কাঠের বিশেষ পুজো। আর এই আচার পালনের মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা হল কোচবিহারের আরাধ্যা দেবী ‘বড়দেবী’র প্রতিমা নির্মাণের কাজ। রাজআমল থেকে চলে আসা ঐতিহ্য অনুযায়ী, বড়দেবীর প্রতিমা তৈরির প্রথম ও প্রধান ধাপ হল ময়না কাঠ পুজো।
শাস্ত্রীয় পুঁথির নিয়ম মেনে রাজপুরোহিতের উপস্থিতিতে নিষ্ঠার সঙ্গে এই পুজো সম্পন্ন করা হয়। মন্দির চত্বরে বিশেষ মন্ত্রোচ্চারণ ও আচারের মাধ্যমে ময়না কাঠটিকে পবিত্র করার পর তা বিশেষ ট্রলিতে স্থাপন করা হয়েছে। বড়দেবীর প্রতিমা নির্মাণের ক্ষেত্রে এই ময়না কাঠ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, এই কাঠটিই প্রতিমার মূল কাঠামোর ‘মেরুদণ্ড’ বা মূলদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ওপর ভিত্তি করেই মৃৎশিল্পীরা মাটি ও অন্যান্য উপাচারের সাহায্যে ধাপে ধাপে দেবীর পূর্ণাঙ্গ অবয়ব গড়ে তুলবেন।
কোচবিহারের বড়দেবীর পুজোর ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো। কোচবিহার রাজপরিবারের সঙ্গে এই পুজোর আবেগ ও ভক্তি জড়িয়ে রয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে, মহারাজ বিশ্বসিংহের আমল থেকে শুরু হওয়া এই পুজো আজ সমগ্র কোচবিহারবাসীর কাছে প্রধান উৎসবের রূপ নিয়েছে। বড়দেবীর পুজো সাধারণ দুর্গাপুজোর থেকে অনেকটাই আলাদা। এখানে দেবীর রূপ, গায়ের রং এবং আরাধনার প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে স্বতন্ত্রতা। রাজ আমলের প্রাচীন পুঁথির বিধান মেনে এখনও প্রতিটি আচার নিখুঁতভাবে পালন করা হয়। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও, বড়দেবী পুজো ঘিরে থাকা ভক্তি, বিশ্বাস এবং রাজপরম্পরা আজও অমলিন। এই পুজোর সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন বলি প্রথা। রাজ আমলে যেমন কঠোর নিয়ম-নিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে আরাধনা হতো, আজও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান হওয়ার পাশাপাশি এই পুজো কোচবিহারের নিজস্ব সংস্কৃতি ও রাজকীয় ঐতিহ্যের এক পরম নিদর্শন। রাজপুরোহিতের মতে, “প্রতি বছর রাধাষ্টমীর তিথিতে নির্দিষ্ট নিয়ম ও শাস্ত্রীয় প্রথা মেনেই ময়না কাঠের পুজো করা হয়। শত শত বছর ধরে যে নিয়ম চলে আসছে, তাতে কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি। প্রাচীন ঐতিহ্যকে আমরা আজও একইভাবে ধরে রেখেছি।” ময়না কাঠ পুজোর সঙ্গে সঙ্গেই কোচবিহারজুড়ে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়ে যায়। পুজো শুরু হতে এখনও কিছুদিন বাকি থাকলেও, এই বিশেষ আচারের পর থেকেই দেবীকে রূপ দেওয়ার প্রস্তুতি জোরকদমে শুরু হয়ে যায়। ময়না কাঠকে ঘিরে প্রতিমা নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলার সাথে সাথে স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের মধ্যেও উৎসাহ ও উদ্দীপনা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে।
