ভোট-পরবর্তী হিংসার, সন্দেশখালিতে মাটি খুঁড়ে উদ্ধার নিহত বিজেপি কর্মীর কঙ্কাল
সংবাদদাতা, সন্দেশখালি: রাজনৈতিক সমীকরণ ও ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গেই দীর্ঘ দিন পর বিচার পাবেন চন্দ্র দাস । একুশের বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী হিংসার পাঁচ বছর পর, সন্দেশখালি ১ নম্বর ব্লকের ন্যাজাট থানার ঝনঝনিয়া গ্রামে মাটি খুঁড়ে বের করা হলো নিহত বিজেপি কর্মী চন্দ্র দাসের হাড়গোড় ও অস্থিবিশেষ। আদালতের নির্দেশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যক্ষ নজরদারিতে সোমবার এই কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের একবার উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে গোটা সন্দেশখালি এলাকায়।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরপরই রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ভোট-পরবর্তী হিংসার আগুন। নিহতের পরিবারের দাবি, সেই সময় স্থানীয় তৃণমূল নেতা শেখ শাহজাহানের অনুগামী দুষ্কৃতীরা বেধড়ক মারধর করে বিজেপি কর্মী চন্দ্র দাসকে। তাঁর ছেলে সুব্রত দাসের অভিযোগ, তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা বাবার ওপর রাস্তায় তাণ্ডব চালায়। কোমরের বেল্ট, লোহার রড, বাঁশের লাঠি নিয়ে অতর্কিতে হামলা চালানো হয়। বাবা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পরও রেহাই মেলেনি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সুযোগটুকুও দেয়নি ওরা। পরিবারের আরও মারাত্মক অভিযোগ তৎকালীন স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। সুব্রতবাবুর কথায়, ন্যাজাট থানার কিছু পুলিশ আধিকারিক, যারা সরাসরি শাহজাহানের অনুগত ছিল, তারা আমাদের বাড়ির গেটের সামনে পাহারা দিত। ওদের মূল নজর ছিল বাবা মারা যাওয়ার পর সঠিকভাে সমাধি দেওয়া হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা। ভয়ের পরিবেশে তখন বিচার চাওয়া তো দূরের কথা, প্রাণভয়ে সঠিক প্রক্রিয়াটুকুও আমরা সম্পন্ন করতে পারিনি। সম্প্রতি রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ন্যাজাট থানায় নতুন করে অভিযোগ দায়ের করে নিহতের পরিবার। সেই লিখিত আবেদনের ভিত্তিতেই প্রশাসনিক স্তরে তৎপরতা শুরু হয়। এদিন ঝনঝনিয়া গ্রামে আস্তিক চন্দ্র দাসের সমাধিস্থলে উপস্থিত হন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিক এবং বিশেষজ্ঞ ফরেন্সিক দল।
কড়া নিরাপত্তার বলয়ে মুড়ে ফেলা হয় পুরো এলাকা। সাধারণ মানুষের ভিড় সামলে নির্দিষ্ট স্থানটি চিহ্নিত করে মাটি খোঁড়া শুরু হয়। প্রায় ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় নিহত কর্মীর দেহের অবশিষ্টাংশ ও হাড়গোড়। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা তা বৈজ্ঞানিক নিয়মে সংগ্রহ ও সিলমোহর করেন। মৃত্যুর সঠিক কারণ ও সময় নির্ধারণের জন্য এই অস্থিবিশেষ পোস্টমর্টেম ও ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে। চন্দ্র দাসের মৃত্যুর বিচার প্রক্রিয়া থমকে ছিল দীর্ঘ পাঁচটা বছর। এবার নতুন আশা নিয়ে সরব হয়েছেন তাঁর পরিবার ও অনুগামীরা। নিহতের মেয়ে পাপিয়া মণ্ডল কান্নাভেজা কণ্ঠে জানান, আমার বাবাকে কোনো অপরাধ ছাড়াই নৃশংসভাবে পিটিয়ে মারা হয়েছিল। যে কারণে আজ আমরা পিতৃহারা, যারা যারা এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নেতা থেকে দুষ্কৃতী, প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমরা এতদিন ভয়ে মুখ খুলতে পারিনি, এবার শেষ দেখে ছাড়ব। ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক পারদ চড়তে শুরু করেছে সন্দেশখালিতে। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, শেখ শাহজাহানের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবেই এতদিন এই নির্মম হত্যাকাণ্ড চাপা পড়ে ছিল। পুলিশ ও দুষ্কৃতীদের যোগসাজশে অপরাধীদের আড়াল করা হয়েছিল। তবে দেরিতে হলেও সত্য সামনে আসছে। অন্যদিকে, এই বিষয়ে স্থানীয় শাসক দল কিংবা অভিযুক্তদের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে উদ্ধার হওয়া এই অস্থিবিশেষের ফরেন্সিক রিপোর্ট এখন চন্দ্র দাসের পরিবারের বিচার পাওয়ার লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে চলেছে।
