বৈকুণ্ঠের খাতা: সুগূঢ় রসের ব্যঞ্জনা…
আশিস চট্টোপাধ্যায়
রবীন্দ্রনাথের সমসময়ে অনেকেই প্রহসন লিখেছেন। তবে রসিকজনের মতে, প্রহসন রচয়িতারূপে রবিঠাকুরের পাশে দাঁড়াতে পারেন এমন লেখক বা নাট্যকার সে সময় খুব কমই ছিলেন। এমনই এক অনবদ্য প্রহসন “বৈকুণ্ঠের খাতা”, লেখা হয়েছিল ১৩০২ সালে। রবীন্দ্রনাথের প্রহসনের প্রধান গুন এর সুতীক্ষ্ণ ব্যঞ্জনাময় সংলাপ। মাত্র ৩টি দৃশ্যে সমাপ্ত এই প্রহসনটির আখ্যানভাগ খুব চমৎকার। যে খাতাটি বৈকুণ্ঠের নিজের কাছে এত প্রিয় তা-ই আবার অন্যের কাছে হাসির খোরাক হয়ে উঠেছে।
বৈকুণ্ঠ মনে করছেন, তার খাতায় মধ্যে দামি সম্পদ আছে, কিন্তু অন্যের তাতে কোনো আগ্রহ নেই । তবু বৈকুন্ঠ নাচার সবাইকে ধরে ধরে তার লেখা তিনি শোনাবেনই, এখান থেকেই সরস কৌতূকের শুরু। এই কৌতুক আরো বেড়ে ওঠে যখন বৈকুণ্ঠের সাথে পাল্লা দিয়ে তার চল্লিশোর্ধ অবিবাহিত সহোদর অবিনাশ রোমান্টিক প্রেমে আক্রান্ত হয়ে প্রেমিকার উদ্দেশ্যে লেখা চিঠির মক্সো বন্ধুদের ধরে ধরে শোনাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে।
আসলে প্রহসনটিতে রবীন্দ্রনাথ এটাই দেখাতে চেয়েছেন, বিশেষ অবস্থার মধ্যে পড়লে সকলেই পাগলাটে ও বাতিকগ্রস্ত হয়ে উঠতে পারে । সুতরাং অন্য কেউ সরল নির্বোধ _ এটা মনে করে অবজ্ঞার হাসি হেসে কোনো লাভ নেই, এইরকম অবস্থায় বুদ্ধিমান ব্যাক্তির বুদ্ধি ও বিচারশক্তি লুপ্ত হয়ে যেতে পারে। আর এটাই এই প্রহসনটির মুল কেন্দ্রবিন্দু।
তবে কেদারের ভুমিকায় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অনবদ্য। পরে তার পঞ্চাশ বছরের জন্মদিন উপলক্ষে কলকাতার ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের সভ্যরা মঞ্চস্থ করেছিলেন এই নাটক। শিশির ভাদুড়ি মহাশয় কেদারের ভুমিকায় অভিনয় করেন, রবীন্দ্রনাথ দর্শক আসনে উপস্থিত ছিলেন, শিশিরবাবুর অভিনয়ের প্রশংসায় বলেন “শিশিরের কেদার , আমার ঈর্ষার পাত্র”, পরে অমল হোমকে চিঠি লিখে জানিয়েছিল তার উচ্ছ্বাসের কথা।
এহেন প্রহসনটিকে নতূনকরে পূর্ণ মর্যাদায় মঞ্চে নিয়ে এল বাউড়িয়া পিপলস রেপার্টরি থিয়েটার। হাওড়ার এই দলটি কাজ করে চলেছে ১৯৯২ সন থেকে, এই দলের কর্ণধার উৎপল ফৌজদার ইতিমধ্যেই বাংলা থিয়েটারে একটি বিশিষ্ট নাম, প্রশেনিয়ম এবং নন-প্রশেনিয়ম উভয় ক্ষেত্রেই তিনি নাট্য প্রযোজনায় সাফল্য দেখিয়েছেন, নাট্যকার হিসেবেও তিনি যথেষ্ট সফল। প্রহসনটিকে সমসময়ের কনটেক্সট- এ বদলাতে গিয়ে রবীন্দ্র রচণার নির্যাস টিকে পুরোমাত্রায় ধরে রেখেছেন। এটাই বর্তমান প্রযোজনার সবথেকে বড়ো গুন। প্রযোজনার আঙ্গিকটি এখানে গড়ে উঠেছে নাটকের বিষয় অনুসরণে, নির্দেশনার চাতুর্যে চরিত্রগুলোর এক একটি বিশেষ আচরণ ও প্রতিক্রিয়া ফুটে উঠেছে। প্রহসন নির্মাণের সার্থকতা এখানেই।
অবিনাশের ভুমিকায় রাজু দত্ত এবং কেদারের ভুমিকায় উন্মেষ ফৌজদার অনায়াস ছন্দে অভিনয় করে গেলেন। তিনকড়ির চরিত্রে সৌভিক প্রামাণিক তুমুল হাস্যরসের আনাচে কানাচে বেদনার উঁকিঝুঁকি সঠিক মাত্রায় ফুটিয়েছেন, সঞ্জু সরকারের ঈশান, চাকরের চরিত্রের চলতি ম্যানারিজিমের ধার না ধেরে আদত মানুষটাকে ছুঁয়ে ফেলেছেন আর বিপিন বাবুর চরিত্রে গৌতম বেরা সত্যিই অনবদ্য, হাস্যরস তৈরিতে এই মাত্রাবোধ সহজলভ্য নয়।
বৈকুণ্ঠের চরিত্রে নির্দেশক উৎপল ফৌজদার আমাদের মুগ্ধ করেন, যতক্ষণ মঞ্চে আছেন, ততক্ষণ যেন মঞ্চ ওর দখলে থাকে সেইসঙ্গে তার সুপরিমিত মঞ্চ ভাবনারও উল্লেখ রাখতে হয়, সেটা হয়ে ওঠে প্রযোজনাটির অন্তর্গত আর্কিটেকচার। উন্মেষ ফৌজদারের আবহ প্রয়োগে নাটকের মেজাজটি চমৎকার ধরা পড়েছে, মমিতা ফৌজদারের পোষাক ভাবনায় লেগে রয়েছে সেই সময়ের গন্ধ আর কালের ক্যানভাসে লক্ষন ঘোষের আলোর আঁকিবুঁকি নান্দনিক তৃপ্তি এনে দেয়। শোনা যায় একসময় ” বৈকুণ্ঠের খাতা” র অভিনয় দেখে গিরিশচন্দ্র নাকি বলেছিলেন, ” এরকম অ্যাকটর সব যদি হাতে পেতুম তো মঞ্চে আগুন ছিটিয়ে দিতে পারতুম”। এই কথাটির সূত্র ধরে এই প্রযোজনার নির্দেশক উৎপল ফৌজদার তার অ্যাক্টরদের নিয়ে শ্লাঘা বোধ করতে পারেন বৈকি।
