বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

রক্ত, হনন, হিংসার মাঝে শাশ্বত প্রেম

15 August, 2026 2:23 PM admin
শেয়ার করুন

অর্ণব চক্রবর্তী :  ছবির একেবারে শেষে পর্দাজোড়া অন্ধকারে ফুটে ওঠে এই পৃথিবীর কোনও এক প্রান্তের কোনও এক নাম না জানা, অজ্ঞাত–অখ্যাত, বাস্তুহারা মানুষের উদ্ধৃতি—‘‌যদি আমার বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকত, তাহলে আমি হাসিমুখে মৃত্যুকেই বেছে নিতাম। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, আমার কাছে আর কোনও বিকল্প ছিল না।’‌

একটু আগেই নির্ভার মানে নিডি যখন পাক–পশ্চিম পাঞ্জাবের ছোট্ট শহর সারগোদায় দাঁড়িয়ে ডেমনশিয়ায় ভোগা তাঁর মৃত্যুপথযাত্রী দাদাজির এলোমেলো, ছেঁড়াছেঁড়া টুকরো স্মৃতির কোলাজগুলোকে সাজিয়ে সাজিয়ে একটা আস্ত সময়ের ছবি তৈরি করার মরিয়া চেষ্টা করে যাচ্ছিল—তখন দাদুর মনের খেয়ালে লিখে যাওয়া কাঁচা–আনাড়ি কবিতাগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে হঠাৎ একটা ভীষণ সত্যির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কেঁপে ওঠে। সে আবিষ্কার করে, তার ৯৫ বছর বয়সের দাদু, গত ৭৮ বছর ধরে এই দেশে, সীমান্তের এই পাশে অমৃতসরে কাটিয়েও, এক মুহূর্তের জন্যও এটাকে নিজের স্ব–দেশ ভাবেননি। তিনি ইশার সিং গ্রেওয়াল। এদেশেই উপার্জন করেছেন, সংসার পেতেছেন, এখন মৃত্যুর মুহূর্ত গুনছেন— কিন্তু ‘‌পরের জাগা’‌, পরের জমিনে ৩৫ বছর পরবাসে থাকার জন্য তিনি চিরটাকাল এক গভীর অপরাধবোধে ভুগে চলেছেন। সেই খেদ তাঁকে জীবনে তিষ্ঠোতে দেয়নি। তাঁকে রুক্ষ্ণ, কঠিন, তিতকুটে করেছে। আর তাঁর সবটুকু সান্ত্বনা, শুশ্রূষার সূত্র রয়ে গেছে কিছু হিজিবিজি গহন–গোপন স্মৃতিরেখায়।

দেশভাগের বড় ইতিহাস, মহা ট্র‌্যাজেডিকে এভাবেই স্মৃতিহারানো এক বৃদ্ধের মনস্তাত্বিক সংকটের ব্যক্তিগত ক্যানভাসে ধরতে চেয়েছেন ইমতিয়াজ আলি। সেখানে বড় ইতিহাস এসেছে সাদা–কালো পুরনো নিউজ রিলে, জিন্না–নেহেরুর বক্তৃতার ফুটেজে, বাস্তুহারা জনতার ভিড়ে ঠাসা ট্রেনের যাতায়াতে আর দরজা ভেঙে ঢুকে আসা দাঙ্গাবাজদের উল্লাসে। তবে ইতিহাসের এই গলিঘুঁজি , নানান বয়ান তৈরি হয় স্মৃতি বিভ্রান্ত ইশারের অন্তরমহলে। সেখানে দাঙ্গা করতে আসা বহিরাগতরা যেন মঙ্গলগ্রহের দস্যু এলিয়েন—নরম জ্যোৎস্নামাখা চাঁদের দেশ সরগোদায় তারা হানা দিতে এসেছে। আবার পেছন থেকে কলকাঠি নাড়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদও ইশারের স্মৃতি–স্বপ্নে আসে, তার প্রিয় ক্রিকেট খেলার এটা–সেটা মেটাফরে। এই চরিত্রটায় নাসিরুদ্দিন শাহ জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয় করেছেন রোগশয্যায় শুয়ে শুয়ে চোখ, ঠোঁট আর মুখের পেশীর আশ্চর্য সৃজনশীল নড়াচড়ায় ও অস্ফু্ট, ছেঁড়াছেঁড়া সংলাপ উচ্চারণে।

আসলে একুশ শতাব্দীর বলিউডের রোমান্স–রাজা ইমতিয়াজ তো এই হিংসা–হনন–ধ্বংস–আগুনের পটভূমিতেও একটা প্রেমের ছবিই তৈরি করেছেন। এক শিখ তরুণ আর মুসলিম তরুণীর। আজকের বিভাজনের ভারতবর্ষে এই প্রেমকে তো ‘‌লাভ জিহাদ’‌ বলা হয়। তখনকার সমাজেও এই সম্পর্কের তেমন অনুমতি ছিল না। তবু ‘‌ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’‌–তে কিনু আর জিয়ার অসমাপ্ত এই প্রেম, সংঘর্ষ, বিভেদ, কাঁটাতার উপেক্ষা করে যেন উপমহাদেশের মরমী বিবেক হয়ে জেগে থাকে। আর এই জাগিয়ে রাখার কাজটা অথৈ ভালবাসার সংবেদনে ভাসিয়ে রাখেন বেদং রায়না ও বনিতা সান্ধু। অন্যদিকে দাদুর স্মৃতি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দুটো সময় ও দুটো দেশের মধ্যে সহমর্মীতার সেতু গড়ে যে নির্ভার, সেই ভূমিকায় দিলজিৎ দোসাঞ্জ যেন মহাভারতের সঞ্জয়ের মতই দ্রষ্টা, সমব্যথী, দার্শনিক।

সরকারি উদ্যোগে যখন ১৪ আগস্টকে ‘‌দেশভাগের বিভীষিকা স্মরণ দিবস’‌ হিসেবে পালন চলছে, তখন নেটফ্লিক্সের এই ছবিটা আমাদের অন্তরে প্রবাহিত হোক। ‌‌‌

প্রতিবেদন

admin