বিপ্লবীদের প্রিয় খাবার
লোপামুদ্রা ভৌমিক :
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু
নেতাজি ছিলেন খাদ্যরসিক। ভক্ত ছিলেন বাঙালি খাবারের। সবচেয়ে পছন্দ ছিল চা ও কফি। দিনে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কাপ চা খেতেন। সঙ্গে তেলেভাজা ও মুড়ি। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা বা গোপন বৈঠকে তাঁর সামনে তেলেভাজ– মুড়ি থাকতই। ছাত্রজীবনে কফি হাউসে গিয়ে কফির সঙ্গে কাটলেট খাওয়া ছিল তঁার প্রিয় শখ। মায়ের হাতের খিচুড়ি, সোনা মুগের ডাল, পুঁইশাকের চচ্চড়ি, মুড়িঘণ্ট এবং মাছের পাতলা ঝোল দিয়ে ভাত খেতেও খুব ভালবাসতেন সুভাষ। সে সময় কলেজ স্কোয়ারের কাছে ‘স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল’–এ গেলে এক আশ্চর্য দৃশ্য চোখে পড়ত। একদল স্বাধীনতা সংগ্রামী রেস্তোরাঁটির চারপাশে বসে দুপুরের খাবার তৈরি হওয়ার অপেক্ষা করছেন। তাঁদের মধ্যে খাঁকি উর্দি পরা, চশমাধারী এক ব্যক্তি অধৈর্য হয়ে পড়ছেন মাঝে মধ্যেই। তঁার যেন আর তর সইছে না। তাগাদা দিচ্ছেন পুঁইশাকের চচ্চড়ি দিয়ে একথালা ভাত এনে দিতে। যেই তিনি খেতে শুরু করেন, তাঁর মুখের প্রশান্তি এবং আনন্দ দেখে বোঝা যায় ঠিক এটাই তিনি খেতে চাইছিলেন! লোকটি আর কেউ নন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। ভীমচন্দ্র নাগের সন্দেশ, রসগোল্লা এবং পিঠেপুলিও সুভাষের ভীষণ পছন্দের।
চন্দ্রশেখর আজাদ
উত্তরভারতের এই বীর বিপ্লবী খাঁটি দুধ এবং রাবড়ি খেতে খুব পছন্দ করতেন। এছাড়াও দুধে তৈরি যে কোনও খাবারই ছিল তাঁর খুব প্রিয়। অতি সাধারণ রোটি এবং ডাল মাখানিও ছিল তঁার অত্যন্ত পছন্দের পদ।
রানি লক্ষ্মীবাঈ
কয়লার আগুনে পোড়ানো ও ঘি চবচবে লিট্টি এবং বেগুন–আলুর চোখা ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। নিজেও খুব ভাল তৈরি করতে পারতেন এই পদ। সেই সঙ্গে দই, লস্যি বা ঘোলও খেতে পছন্দ করতেন। বাড়িতে বানানো রকমারি মিষ্টি ছিল লক্ষ্মীবাঈয়ের অন্যতম পছন্দের পদ।
লাল বাহাদুর শাস্ত্রী
ফোলা ফোলা পুরি এবং মশলাদার ছোলার ডাল বা সবজি খেতে ভীষণই ভালবাসতেন। বিপ্লবী আন্দোলনের সময় গোপন আস্তানায় বিপ্লবীরা এমন খাবারই খেতেন যা সহজে তৈরি করা যায় এবং শরীরকে দীর্ঘক্ষণ শক্তি দেয়। এজন্য খিচুড়ি ছিল তালিকার সবচেয়ে ওপরে। এটাই ছিল বিপ্লবীদের বড় ভরসা। এছাড়াও লুচি–ছোলার ডাল খেতে ভালবাসতেন লালবাহাদুর।
মহাত্মা গান্ধী
সামান্য হলুদ ও আদা দিয়ে সেদ্ধ মুগ ডাল এবং ভাতের প্রতি তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিল। লাউ বা কুমড়োর মতো সবজি দিয়ে সাধারণ নিরামিষ তরকারির সঙ্গে চাপাটি বা রুটি খেতেন। কলা, আম, পেঁপে এবং আঙুরের মতো ফল তাঁর প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকত। নিয়মিত পান করতেন ছাগলের দুধ। খেতেন কলা ও বাদামের পেস্ট বা বাদাম ও ভেজানো কিশমিশ। গান্ধীজি খাবার তৈরির ক্ষেত্রে তেল, অতিরিক্ত মশলা এবং অতিরিক্ত নুন একেবারেই পছন্দ করতেন না। বিশ্বাস করতেন, খাবার কেবল শরীরকে শক্তি জোগানোর মাধ্যমই নয়। এটি মন ও আত্মাকে সুস্থ, সুন্দর রাখারও গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত চিঠি, ডায়েরি এবং বিভিন্ন স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় যে তিনি রোজকার জীবনে অত্যন্ত সাধারণ ও পুষ্টিকর বাঙালি খাবার খেতে ভালবাসতেন। মাখন লাগানো বিস্কুট , আধসিদ্ধ ডিম বা ডিমের পোচ, দুধ–কফি বা দুধ–চা খুবই প্রিয় ছিল তঁার। কলকাতার বনেদি বাঙালি পরিবারের সন্তান হওয়ায় ভাত, ডাল, মাছের ঝোল এবং ঐতিহ্যবাহী বাঙালি মিষ্টি, পিঠে বা পায়েসের প্রতি তাঁর স্বাভাবিক ঝোঁক ছিল। রাজনৈতিক ব্যস্ততা এবং দেশসেবার কারণে তিনি সবসময়ই আড়ম্বরহীন ও সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং সাধারণ খাবার খেতেই বেশি পছন্দ করতেন।
জওহরলাল নেহেরু
রোগ্যান জোস— কাশ্মীরি এই পদটি ছিল নেহেরুর অত্যন্ত প্রিয়। যদিও তিনি মূলত শাকসবজি ও হালকা খাবারই বেশি খেতেন। একেবারেই মশলা ও লঙ্কা খেতে অভ্যস্ত ছিলেন না। মাংস খেতেন। কিন্তু তা খুব অল্প পরিমাণে। শাকসবজি ও ফল খেতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন। নিরামিষ খাবারের প্রতি ঝোঁক ছিল বেশি। সকালে গরম দুধ দিয়ে ঘন কফি এবং বিকেলে এক কাপ হালকা চা পান ছিল তঁার রোজকার অভ্যেস।
ভগৎ সিং
অত্যন্ত সাধারণ এবং দেশি খাবার পছন্দ করতেন ভগৎ সিং । যার মধ্যে অন্যতম ছিল মাটির ভাঁড়ে বা কুলহড়ে ঘন রবড়ির স্তর দেওয়া গরম দুধ। আগ্রায় যখন তিনি ব্রিটিশদের থেকে আত্মগোপন করেছিলেন, তখন রাতে গোপনে একটি দোকান থেকে তিনি এই মিষ্টি দুধ খেতেন। বিপ্লবী আস্তানায় থাকার সময় তাঁর প্রধান খাবার ছিল অত্যন্ত সাধারণ ডাল, ভাত এবং সবজি। তবে তঁার অন্যতম প্রিয় খাবার ছিল গরম গরম কড়ি এবং ভাত। কড়ি হল টক–ঝাল স্বাদের বিশেষ ধরণের পদ। যা গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। দই এবং বেসন দিয়েও ঐতিহ্যবাহী কড়ি তৈরি করা হয়। এই পদটি গোয়া ও পর্তুগিজ প্রভাবপুষ্ট। যা প্রচুর লাল লঙ্কা, ভিনিগার ও রসুনের ঝাঁঝালো স্বাদের জন্য পরিচিত। এটি বিশ্বের অন্যতম ঝাল কারি। মাংসের প্রতি ছিল অনীহা। পানীয়র মধ্যে প্রিয় ছিল তাজা কমলা লেবুর রস। ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ ফাঁসির আগে তিনি শেষ খাবারটি খেতে চেয়েছিলেন বগা নামে এক দলিত জেলকর্মীর কাছে। যাঁকে তিনি ভালবেসে ‘বেবে’ বা ‘মা’ বলে ডাকতেন। ফাঁসির দিন দুপুরে আইনজীবী প্রাণনাথ মেহতা যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান, তখন ভগৎ সিং তাঁর কাছে রসগোল্লা খেতে চেয়েছিলেন। আনিয়ে দেওয়া হলে পরম তৃপ্তির সঙ্গে খেয়েওছিলেন।
