বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

বাঙালি বিপ্লবীদের ক্রীড়াপ্রেমের অজানা ইতিহাস

15 August, 2026 1:01 PM admin
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদন: ১৫ আগস্ট এলেই স্বাধীনতার ইতিহাস যেন ফিরে আসে নতুন করে।
ক্ষুদিরামের ফাঁসির মঞ্চ, বাঘা যতীনের বালেশ্বর, মাস্টারদা সূর্য সেনের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন কিংবা নেতাজির ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও…’—এই সবই আমাদের জাতীয় স্মৃতির অংশ। কিন্তু এই ইতিহাসের আর একটি অধ্যায় তুলনায় অনেক কম আলোচিত। সেই অধ্যায়ে বন্দুকের আগে ছিল লাঠি, বিপ্লবের আগে ছিল ব্যায়াম, আর গোপন সংগঠনের ভিত তৈরি হতো আখড়া, কুস্তির মাটি, সাঁতারের ঘাট কিংবা ফুটবল মাঠে।

ঔপনিবেশিক বাংলায় শরীরচর্চা নিছক স্বাস্থ্যচর্চা ছিল না, ছিল আত্মমর্যাদা অর্জনের পথ। জাতীয়তাবাদী নেত্রী সরলা দেবী চৌধুরাণী তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’-য় লিখেছেন, দুর্বলতার বদনাম ঘোচাতে বাঙালি যুবকদের শরীরচর্চা ও বীরত্বচর্চায় উদ্বুদ্ধ করাই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। সেই ভাবনা থেকেই তিনি লাঠিখেলা, তরোয়াল চালনা এবং ব্যায়াম প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই উদ্যোগই পরবর্তী সময়ে বিপ্লবী সংগঠনগুলির শারীরিক সংস্কৃতির ভিত তৈরি করে।

সেই ধারাকেই আরও সুসংগঠিত রূপ দেয় অনুশীলন সমিতি। সমিতির অন্যতম সংগঠক পুলিনবিহারী দাস তাঁর স্মৃতিকথা ‘আমার জীবন কাহিনী’-তে লিখেছেন, ‘লাঠিখেলা কেবল খেলা নয়, আত্মরক্ষার বিদ্যা।’ তাঁর নেতৃত্বে ঢাকার টিকাটুলির আখড়ায় শত শত তরুণ লাঠিখেলা, কুস্তি, দৌড়, সাঁতার ও শরীরচর্চার প্রশিক্ষণ নিতেন। বাইরে থেকে এগুলি ছিল ব্যায়ামাগার, কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসনের অগোচরে সেখানেই তৈরি হচ্ছিল সংগঠিত প্রতিরোধের ভিত।

যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, যাঁকে আমরা বাঘা যতীন নামে চিনি, তাঁর জীবনেও শরীরচর্চার গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। বিপ্লবী জীবনীকারদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, নিয়মিত কুস্তি, সাঁতার, দীর্ঘপথ হাঁটা এবং ঘোড়সওয়ারির অনুশীলন তাঁকে অসাধারণ শারীরিক সক্ষমতা দিয়েছিল। সেই কারণেই তরুণ বিপ্লবীদেরও তিনি শরীরচর্চার উপর জোর দিতে উৎসাহিত করতেন। শক্তিশালী মন গড়তে যেমন আদর্শের প্রয়োজন, তেমনই শক্তিশালী শরীরও যে জরুরি—এই বিশ্বাসই ছিল সেই প্রজন্মের।

আন্দোলনের সেই আবহ ছড়িয়ে পড়েছিল খেলার মাঠেও। ১৯১১ সালে মোহনবাগানের আইএফএ শিল্ড জয় ছিল তার উজ্জ্বল উদাহরণ। খালি পায়ে খেলতে নেমে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে হারিয়ে দিয়েছিল একদল ভারতীয় যুবক। ক্রীড়া-ইতিহাসবিদ অমিতাভ চট্টোপাধ্যায় তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, এই জয় কেবল ক্রীড়া সাফল্য ছিল না; তা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় আত্মবিশ্বাসেরও প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে পরে তৈরি হয় বাংলা চলচ্চিত্র ‘এগারো’, যা নতুন প্রজন্মকে সেই ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

আজ শরীরচর্চা মানেই জিম, ম্যারাথন বা ফিটনেস অ্যাপ। কিন্তু একশো বছর আগে বাংলার যুবকদের কাছে শরীরচর্চার অর্থ ছিল আরও গভীর। স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখার আগে নিজেদের তৈরি করা, ভয়কে জয় করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জন করা। তাই স্বাধীনতা দিবসে বিপ্লবীদের হাতে ধরা রিভলভার কিংবা বোমার পাশাপাশি লাঠি, ফুটবল, কুস্তির মাটি আর ব্যায়ামাগারের কথাও মনে রাখা উচিত। কারণ স্বাধীনতার লড়াই শুধু রণাঙ্গনে জেতা হয়নি, তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল খেলার মাঠেই।

প্রতিবেদন

admin