সুযোগের অপেক্ষায় ‘দিমাগি নকশাল’রা, দেশে চলছে ছায়াযুদ্ধ! স্বাধীনতা দিবসে কড়া হুঁশিয়ারি মোদির
নয়াদিল্লি: বন্দুকের নলে বিপ্লবের দিন শেষ! জঙ্গলমহল বা দণ্ডকারণ্য থেকে সশস্ত্র নকশালপন্থা এখন কার্যত অবলুপ্ত। কিন্তু বিপদ কি সত্যিই কেটেছে? শনিবার, দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে ঐতিহাসিক লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে এক নতুন ও গভীর বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর দ্ব্যর্থহীন বার্তা, জঙ্গল থেকে সশস্ত্র মাওবাদীদের নির্মূল করা গেলেও সমাজের আনাচে-কানাচে ঘাপটি মেরে বসে রয়েছে ‘মগুজে নকশাল’ বা ‘দিমাগি নকশাল’-রা । এরা কেবল সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। দেশে চলছে এক অদৃশ্য ছায়াযুদ্ধ! আর তাই এবার এই মগজে নকশালদের খুঁজে বের করে সমাজ থেকে সম্পূর্ণ আইসোলেট বা বিচ্ছিন্ন করার সঠিক সময় এসেছে।
শনিবারের এই বিশেষ দিনে, দেশবাসীর উদ্দেশে এক দীর্ঘ এবং তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে দেশের সার্বিক উন্নয়ন, অর্থনীতির প্রসার, আগামী দিনের রূপরেখা এবং ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার স্বপ্নের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। আর সেই প্রসঙ্গেই সরাসরি ‘দিমাগি নকশাল’ বা মগুজে নকশালদের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন নরেন্দ্র মোদি।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় যে ‘আরবান নকশাল’ বা শহুরে নকশাল শব্দবন্ধটি তুমুল চর্চায় ছিল, এটি তারই এক আধুনিক সংস্করণ। এরা জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় না, হাতে বন্দুকও তুলে নেয় না। বরং শহরের বিলাসী জীবনযাপনের আড়ালে থেকে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিভাজন, ঘৃণা ও অশান্তির বীজ বপন করে। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, “এই মগুজে নকশালরা সব সময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। এরা প্রতিনিয়ত হিংসা, অরাজকতা এবং অস্থিরতা তৈরির সুযোগ খোঁজে।” তাঁর অভিযোগ, এরা নিজেদের মতাদর্শ দিয়ে সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে যুবসমাজকে ভুল পথে চালিত করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । তাঁর মতে, দেশের স্বাভাবিক অগ্রগতি স্তব্ধ করতে নকশালরা এক প্রকার ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ার চালাচ্ছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
এদিন লালকেল্লা থেকে মোদি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দেন, ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে দেশ থেকে সশস্ত্র মাওবাদীদের নির্মূল করার যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য কেন্দ্রীয় সরকার নিয়েছিল, তা ইতিমধ্যেই সফল হয়েছে। ২০১৪ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতকে নকশালমুক্ত করার সংকল্প নিয়েছিল তাঁর সরকার। মোদি বলেন, “জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা সশস্ত্র নকশালদের আমরা নির্মূল করে দিয়েছি। দেশ এই প্রবল অভ্যন্তরীণ সঙ্কট থেকে অনেকটাই মুক্তি পেয়েছে।”
তবে এই সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে ভারতের এক রক্তাক্ত অতীতের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী জানান, গত চার দশক ধরে দেশের একটা বিশাল অংশ এই মাওবাদীদের কব্জায় ছিল। বন্দুকের নলে দেশের সংবিধানকে কার্যত তছনছ করে দিয়েছিল তারা। মাওবাদী হামলায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি পুলিশকর্মী নির্মমভাবে শহিদ হয়েছেন। বহিঃশত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে যত না প্রাণহানি হয়েছে, তার চেয়েও বেশি রক্ত ঝরেছে দেশের মাটিতে এই অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসের কারণে। কত সাধারণ মানুষের, কত অসহায় মা-বাবার স্বপ্ন চুরমার হয়ে গিয়েছে, কত যুবকের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে গিয়েছে, সেই মর্মস্পর্শী পরিসংখ্যানও এদিন উঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে।
সশস্ত্র আন্দোলনের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি নকশাল অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে যে এখন উন্নয়নের জোয়ার এসেছে, সে কথাও জোরালোভাবে তুলে ধরেন নরেন্দ্র মোদি। একসময় যে এলাকাগুলিতে মাওবাদীদের অবাধ বিচরণ এবং ত্রাসের রাজত্ব ছিল, সেখানে এখন উন্নয়নের ছবি স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, “মানুষের সরকারের প্রতি আস্থা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। দেশের অগ্রগতির লক্ষ্যে যে সমস্ত উন্নয়নমূলক কাজ শুরু হয়েছিল, তা এখন প্রবল গতি পেয়েছে।” গত এক দশকে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির লাগাতার অভিযানের ফলে হাজার হাজার মাওবাদী আত্মসমর্পণ করে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে এসেছেন বলেও তিনি জানান।
সশস্ত্র নকশালপন্থাকে হারানো গেলেও, মতাদর্শগত স্তরে যে লড়াই এখনও বাকি, লালকেল্লার ভাষণে সেটাই ছিল মোদির মূল সতর্কবার্তা। তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ, এবার এই ‘মগুজে নকশাল’ বা ‘দিমাগি নকশাল’-দের সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। বিষাক্ত চিন্তাভাবনা যাতে কোনোভাবেই আর নতুন প্রজন্মকে গ্রাস করতে না পারে, তার জন্য কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
দেশের যুবসমাজের কাছে তাঁর উদাত্ত আহ্বান, তাঁরা যেন এই ধরনের বিভেদকামী শক্তির ফাঁদে পা না দিয়ে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার মূল স্রোতের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেন। সন্ত্রাসের কালো অধ্যায় চিরতরে শেষ করে এক নতুন, শক্তিশালী এবং একজোট ভারত গড়ার লক্ষ্যেই যে তাঁর সরকার অবিচল, স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার প্রাকার থেকে সেই বার্তাই সুনিশ্চিত করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
