রাজ্যজুড়ে হোটেল-রেস্তোরাঁয় হানা, উদ্ধার পচা খাবার
সংবাদদাতা: পুজোর আগে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, খাদ্য সুরক্ষাসহ একাধিক বিষয়ে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে রাজ্য সরকার। সোমবার থেকেই কলকাতাসহ জেলায় জেলায় হোটেলগুলির লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ফুড লাইসেন্স-সহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বুধবার সকালে ট্যাংরা ,সল্টলেক সিটি সেন্টার, বিধাননগর, বাদুড়িয়া, বর্ধমান,মেদিনীপুরসহ একাধিক নামী দোকানে হানা দিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন খাদ্য দপ্তরের আধিকারিকরা। এদিন বিভিন্ন রেস্তোরাঁর রান্নাঘর থেকে উদ্ধার হয়েছে কিলো কিলো পচে যাওয়া মাংস। অভিযোগ, রেস্তোরাঁয় মজুত করা ওই মাংসের একাংশ পচা অবস্থায় ছিল। খবর পেয়ে খাদ্য দপ্তরের আধিকারিক, পুরসভার কর্মী এবং পুলিশ যৌথভাবে রেস্তোরাঁয় অভিযান চালায়। ঘটনার পর রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষকে খাদ্য দপ্তর নোটিশ ধরিয়েছে। খাদ্যের গুণমান ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। ক্রেতা সুরক্ষা সপ্তাহকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ও শহরে হোটেল, রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান এবং অন্যান্য খাদ্যপ্রতিষ্ঠানে শুরু হয়েছে আচমকা পরিদর্শন ও তল্লাশি।
উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে একটি শপিং মলের ফুড কোর্টে অভিযান চালিয়ে ফ্রিজে বেশ কয়েক দিন ধরে রাখা কাঁচা মাংস, ফাঙ্গাসযুক্ত খাবার এবং মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়েছে । অভিযোগ, পরিদর্শনকারী দলকে আসতে দেখে কিছু খাবার ফেলে দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছিল। অনিয়ম ধরা পড়ায় একাধিক দোকানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা হয়েছে।
জেলার অন্য প্রান্ত বাদুড়িয়াতেও একটি রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৪০ কেজি পচা মুরগি ও খাসির মাংস উদ্ধার করা হয়েছে । সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না মিললে হোটেল বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
বুধবার খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা বর্ধমান শহরের রাধাবল্লব মিষ্টান্ন ভান্ডার এবং গণেশ মিষ্টান্ন ভান্ডারে অভিযান চালান। শুধু দোকানেই নয়, দুটি প্রতিষ্ঠানের মিষ্টি তৈরির কারখানাতে গিয়েও বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী পরীক্ষা করেন । অভিযান চলাকালীন মিষ্টি তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণের গুণমান খতিয়ে দেখা হয়। ওই মিষ্টির দোকান থেকে প্রায় ১০ কেজি ৫০০ গ্রাম পনির বাজেয়াপ্ত করেন খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা। এছাড়াও ঘি-সহ অন্যান্য বেশ কয়েকটি খাদ্যসামগ্রীর নমুনা পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা হয়েছে। জানা গেছে, দোকান থেকে ২ কেজি ঘি পরীক্ষার জন্য নগদ টাকায় কিনে নিয়ে গিয়েছেন অধিকারিকরা । দোকানে ব্যবহৃত মসলা এবং অন্যান্য উপকরণও পরীক্ষা করা হয়।
শান্তিপুর থানার পুলিশ ও পুরসভা এবং রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের আধিকারিকরা যৌথভাবে একটি হোটেল, মিষ্টির দোকান ও বিরিয়ানির দোকানে খাদ্যের গুণগত মান খতিয়ে দেখেন। অভিযানে একাধিক অসঙ্গতি নজরে আসে। কোথাও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার ও খাদ্য উপকরণ রাখা ছিল, আবার কোথাও মেয়াদ উত্তীর্ণ মসলা ও প্যাকেটজাত উপকরণ পাওয়া যায়।ডিপ ফ্রিজে বিভিন্ন ধরনের খাবার একসঙ্গে রাখার অভিযোগে বেশ কিছু উপকরণ বাজেয়াপ্ত করে নষ্ট করে দেওয়া হয়। হলুদ, সসসহ কয়েকটি উপকরণ পরীক্ষার জন্য নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করা হয়। মিষ্টির দোকান থেকে পুরনো পাটালি গুড় ও মিষ্টি তৈরির কিছু উপকরণও নেওয়া হয়। দপ্তরের বিশেষ গাড়িতে থাকা পরীক্ষার সরঞ্জামের মাধ্যমে বেশ কিছু নমুনা তাৎক্ষণিক পরীক্ষা করা হয়।দোকানদারদের সতর্ক করার পাশাপাশি সংগ্রহ করা নমুনার তালিকাও ।
বীরভূমের সিউড়িতেও একাধিক খাবারের দোকান ও মিষ্টির দোকানে তল্লাশি চালানো হয়েছে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মজুত করে রাখা আচার এবং ফ্রিজে রাখা বাসি মাছ, মাংস ও পনির বাজেয়াপ্ত করার খবর এসেছে। পূর্ব বর্ধমানের শক্তিগড়ে ল্যাংচা হাবের একাধিক দোকান, হোটেল এবং রাস্তার ধারের খাবারের দোকানেও অভিযান চালিয়ে খাবার সংরক্ষণ ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে। কিছু খাবার নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।
মুর্শিদাবাদের বহরমপুরেও একটি নামী হোটেলে আচমকা পরিদর্শন চালানো হয়। হোটেলের স্টোররুম থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যসামগ্রীর মেয়াদ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হয়েছে।
শুধু দক্ষিণবঙ্গেই নয়। শিলিগুড়ি, আসানসোল-সহ রাজ্যের বিভিন্ন শহরেও খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে নজরদারি জোরদার করার কথা প্রশাসনিক মহলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বারুইপুর ও সোনারপুর-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকাতেও খাবারের মান পরীক্ষা করতে নমুনা সংগ্রহের খবর পাওয়া গেছে।
খাবার সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, বাসি বা মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার ব্যবহার না করা, রান্নাঘর পরিষ্কার রাখা, খাদ্যসামগ্রী ঢেকে রাখা এবং কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর জোর দিচ্ছে রাজ্য প্রশাসন। নিয়ম ভাঙলে প্রথমে নোটিশ, পরে জরিমানা এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের মতো পদক্ষেপ করা হতে পারে।
