শীর্ষ আদালতের নির্দেশে স্বস্তির মাঝেই আশঙ্কার প্রহর গুনছেন ‘যোগ্য’ শিক্ষকরা
নিজস্ব প্রতিনিধি : প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির জেরে বাতিল হওয়া ২০১৬ সালের এসএসসি (SSC) প্যানেল মামলায় অবশেষে বড়সড় স্বস্তি পেল রাজ্য সরকার এবং হাজার হাজার ‘যোগ্য’ শিক্ষক-শিক্ষিকা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আবেদন মেনে নিয়ে নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময়সীমা ২০২৭ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বাড়িয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার, ৩১ অগস্ট শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশের ফলে নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির মোট ৩৫ হাজার শূন্যপদে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করতে রাজ্য প্রশাসন কিছুটা বাড়তি সময় হাতে পেল। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ২০২৭ সালের ৩১ মে এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে এবং এর পর আর কোনো সময়সীমা বৃদ্ধি করা হবে না।
কিন্তু আদালত থেকে বাড়তি সময় মেলার পর রাজ্যের হাজার হাজার ‘যোগ্য’ চাকরিহারা এবং কর্মরত শিক্ষকদের মনে কি সত্যিই পূর্ণাঙ্গ স্বস্তি ফিরল? নাকি দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা আর জীবনের টানাফোড়েন তাঁদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিল? বাস্তব পরিস্থিতি খতিয়ে দেখলে দেখা যাচ্ছে, আদালতের এই পদক্ষেপে এক সাময়িক নিশ্বাস ফেলার সুযোগ পেলেও, কাজের কাজ বা সমস্যার স্থায়ী সুরাহা কতটা হবে— তা নিয়ে চরম প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
স্বস্তি বনাম অনিশ্চয়তার দোলাচল
আদালতের রায়ে চাকরি খোয়ানোর ভয় থেকে সাময়িক রেহাই পাওয়ায় একদল শিক্ষক স্বস্তির শ্বাস ফেললেও, অপর অংশ এটিকে ‘অনিশ্চয়তার মেয়াদ বৃদ্ধি’ বলেই মনে করছেন। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কোনো দায় না থাকা সত্ত্বেও বিগত সুপ্রিম নির্দেশের পর ‘যোগ্য’ হিসেবে দু’দফায় কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন শিক্ষকরা। কিন্তু ওবিসি সংরক্ষণসহ একাধিক আইনি জটিলতায় ২০২৬-এর অগস্টের মধ্যেও নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হয়নি।
‘যোগ্য শিক্ষক শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চ’-এর মুখপাত্র মেহবুব মণ্ডল বলেন, “হাতে খুব বেশি সময় নেই। সময়সীমার মধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। নিয়োগপ্রক্রিয়ার মধ্যে যেসব সমস্যা তৈরি হচ্ছে, সেগুলো দ্রুত সমাধানের জন্য সরকারের উচিত সব পক্ষকে নিয়ে অবিলম্বে আলোচনায় বসা। কারণ এর সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে।”
অন্যদিকে, চাকরিহারা ‘যোগ্য’ শিক্ষক চিন্ময় মণ্ডলের বক্তব্য, “আজই হয়তো আমাদের চাকরিজীবনের ইতি হতে পারত। সময় বাড়ায় সুবিধে হলো ঠিকই, কিন্তু এটাই সুরাহা নয়। ২০২৭ সালের ৩১ মে-র মধ্যেই প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে, কারণ শীর্ষ আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে এর পর আর এক দিনও সময় বাড়ানো হবে না।”
নতুন পরীক্ষায় অকৃতকার্যদের ভাগ্য নিয়ে তৈরি প্রশ্নচিহ্ন
দীর্ঘ এক দশক শিক্ষকতা করার পর, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির খেসারত দিতে গিয়ে ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে নতুন করে ফের স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় বসতে বাধ্য হয়েছিলেন এই শিক্ষকরা। পারিপার্শ্বিক মানসিক চাপ ও বয়সের কারণে অনেকেই সেই পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি। সুপ্রিম কোর্টের আজকের রায়ের ফলে তাঁরা হয়তো নির্ধারিত সময়সীমা পর্যন্ত সবেতন কাজ করতে পারবেন, কিন্তু তার পর তাঁদের ভাগ্য কোন দিকে মোড় নেবে— তা নিয়ে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক স্কুলের ভৌতবিজ্ঞানের শিক্ষক অমিতরঞ্জন ভুঁইয়া আক্ষেপ করে বলেন, “সরকার কিছুটা সময় পেল, আমরাও পেলাম। কিন্তু আমাদের মূল সমস্যার তো কোনো সমাধান হলো না! আমাদের চাকরি আদতে আছে কি নেই, সেটাই এখনও ধোঁয়াশা।”
স্মরণে শুভেন্দুর সেই প্রতিশ্রুতি: নজর নতুন সরকারের পদক্ষেপে
শিক্ষকদের পাশাপাশি চরম দুরবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ২০১৬ সালের প্যানেলে চাকরি পাওয়া শিক্ষাকর্মীরাও। শিক্ষকদের মতো কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগটুকুও তাঁরা পাননি। প্রায় দেড় বছর ধরে তাঁরা সম্পূর্ণ কর্মহীন ও বেতনহীন। ২০২৬-এর মার্চে নেওয়া শিক্ষাকর্মী নিয়োগের পরীক্ষার ফলও এখনও প্রকাশ করেনি এসএসসি।
পাথরপ্রতিমা আনন্দলাল আদর্শ বিদ্যালয়ের গ্রুপ-সি পদে চাকরি হারানো সুজয় সর্দার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দোষ না করেও চাকরি হারিয়েছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করেছিলাম এবং সরকার পরিবর্তনের দাবি তুলেছিলাম। এখন সরকার বদলেছে, কিন্তু আমাদের কথা কি কেউ ভাবছে?”
শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী উভয় পক্ষই তুলে আনছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্বাচনের আগের আশ্বাসের কথা। বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন শুভেন্দু অধিকারীদের কাছে গিয়ে যখন আন্দোলনকারীরা দেখা করেছিলেন, তখন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল— নতুন সরকার গঠিত হলে ‘যোগ্য’ শিক্ষকদের চাকরি হারানোর বিষয়টি আইনিভাবে খতিয়ে দেখে মানবিক পদক্ষেপ করা হবে।
আজ সেই প্রসঙ্গ টেনে শিক্ষক অমিতরঞ্জন ভুঁইয়া ও শিক্ষাকর্মী সুজয় সর্দারের স্পষ্ট দাবি, “রাজ্যে নতুন সরকার শপথ নেওয়ার তিন মাস পার হয়ে গেলেও আমাদের নিয়ে কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সরকার মানবিক দিক বিবেচনা করে অবিলম্বে আমাদের নিয়ে আলোচনায় বসুক এবং জীবন বাঁচানোর দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।”
ফলে শীর্ষ আদালতের রায়ে আইনি সময়সীমা বাড়লেও, ‘যোগ্য’ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের জীবন থেকে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ এখনই কাটছে না। সুপ্রিম সময়সীমার মধ্যে রাজ্য সরকার কীভাবে নতুন নিয়োগ ও পুরনো যোগ্যদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করে, সেদিকেই তাকিয়ে রাজ্যের শিক্ষামহল।
