ফলতাকে ছাপিয়ে যেতে হবে নন্দীগ্রামেই, মার্জিন বাড়ানোর হুঙ্কার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর
নন্দীগ্রাম: একুশের বিধানসভা নির্বাচনে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করে প্রথম জয়ের মুখ দেখিয়েছিল নন্দীগ্রাম।
আর ছাব্বিশের নির্বাচনে রাজ্য জয়ের পাশাপাশি সেই নন্দীগ্রাম ফের বুকে টেনে নিয়েছিল ‘ঘরের ছেলে’ শুভেন্দু অধিকারীকে। ছাব্বিশের সাধারণ নির্বাচনে ভবানীপুরের পাশাপাশি নন্দীগ্রামেও জয়ী হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী একটি কেন্দ্র ছাড়তে হওয়ায় তিনি নন্দীগ্রাম কেন্দ্রটি ছেড়ে দেন। তবে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পর প্রথমবার নন্দীগ্রামের মাটিতে পা রেখেই তিনি কথা দিয়েছিলেন, পদত্যাগের নিয়ম যাই হোক না কেন, নন্দীগ্রামকে তিনি চিরকাল বুক দিয়ে আগলে রাখবেন। সোমবার রেয়াপাড়ার ঐতিহাসিক প্রশাসনিক সভা থেকে সেই কথারই বাস্তব রূপরেখা তুলে ধরলেন রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী তথা নন্দীগ্রামের ‘ঘরের ছেলে’ শুভেন্দু অধিকারী।
এদিনের সভা থেকে সাম্প্রতিক দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে আনেন মুখ্যমন্ত্রী। সম্প্রতি ফলতার উপনির্বাচনে বিজেপি ১ লক্ষ ৯ হাজার ভোটের বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকসভা কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারে পদ্ম ফুটিয়েছে। নন্দীগ্রামের আসন্ন উপনির্বাচনের আগে সেই ফলের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নন্দীগ্রামবাসীকে বিশেষ আহ্বান জানান তিনি। ২০১৬ সালে তৃণমূলের টিকিটে এই নন্দীগ্রাম থেকেই তিনি ৮১ হাজারের বেশি ভোটে জিতেছিলেন। সেই স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে সভায় উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘একবার ৮২ হাজার ভোটে জিতিয়েছিলেন, মনে আছে তো? ফলতার উপরে যাবেন তো? দু’হাত তুলে কথা দিন। রাজ্যের উন্নয়ন তো রাজ্য সরকার করবেই, কিন্তু আমার অগ্রাধিকারের এক নম্বরে থাকবে এই নন্দীগ্রাম।’’
রেয়াপাড়ায় পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের নানা উন্নয়নমূলক প্রকল্পের শুভ সূচনা ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে প্রশাসনিক দিক থেকে নন্দীগ্রামকে ঢেলে সাজানোর বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান থেকে শুরু করে অবকাঠামো— সব ক্ষেত্রেই একাধিক মেগা প্রকল্পের কথা ঘোষণা করা হয়:
-
যোগাযোগ ও রাস্তাঘাট: গত সাড়ে তিন থেকে চার মাসে নন্দীগ্রামের ১৭টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় মোট ৩২টি নতুন রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ হয়েছে। বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে উদ্বোধন হয়েছে এবং নতুন কয়েকটি রাস্তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।
-
হলদিয়া-নন্দীগ্রাম ব্রিজ: বহুদিনের বকেয়া ও আটকে থাকা হলদিয়া-নন্দীগ্রাম সংযোগকারী ব্রিজের কাজের অগ্রগতির কথা নিশ্চিত করেন মুখ্যমন্ত্রী। খুব দ্রুত এর ‘ভূমিপূজন’ হতে চলেছে এবং তিনি নিজে ব্রিজের ওপর দিয়ে প্রথম গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন।
-
রেল সংযোগের অগ্রগতি: দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা নন্দীগ্রাম-বটতলা রেল প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ৬ একর জমির মধ্যে ইতিমধ্যেই সাড়ে তিন একর জমি রেলকে হস্তান্তর করেছে নতুন রাজ্য সরকার। আগামী মার্চের মধ্যে বাকি জমিও রেলকে দিয়ে দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, “নন্দীগ্রাম-বটতলা রেলস্টেশনে উঠে বাজকুলে গিয়ে নামব। প্রথম ট্রেনে আমিই আপনাদের নিয়ে চড়ব।”
-
আবাসন ও কর্মসংস্থান: প্রধানমন্ত্রী বিকশিত ভারত জিরাম-জি জব কার্ড হোল্ডারদের জন্য ১২৫ দিনের কাজের কাজের শুভ সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি, চলতি বছরেই নন্দীগ্রামে ১১,৭০০টি নতুন বাড়ি তৈরির ঘোষণা করা হয়, যার প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা ইতিমধ্যেই বরাদ্দ করা হচ্ছে।
-
স্বাস্থ্য ও পরিষেবা:
-
৬০ বেড বিশিষ্ট রেয়াপাড়া হেলথ সেন্টার ও একটি নতুন পুলিশ মর্গের ঘোষণা।
-
নন্দীগ্রাম জেলা হাসপাতালে রোগীদের আত্মীয়দের জন্য নতুন ‘মা-মাতৃ’ বিল্ডিং নির্মাণ।
-
নন্দীগ্রাম সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে ‘জনৌষধি কেন্দ্র’ এবং সাশ্রয়ী ‘মা-আহার’ ক্যান্টিনের শুভ সূচনা।
-
‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পের অধীনে ইতিমধ্যেই ২.৫ লক্ষ মানুষকে বিনামূল্যে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার অধিকার দেওয়া হয়েছে। নিয়মের জটিলতায় আটকে থাকা অবশিষ্ট ৮৭ হাজার মানুষকে ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবীমা’ কার্ড প্রদান করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে দেশের ১৯০০টি প্রথম সারির সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা মিলবে।
-
-
সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য: ১৭টি অঞ্চলের যোগ্য ৬৭ হাজার মহিলার অ্যাকাউন্টে আগস্ট মাসে ৩,০০০ টাকা করে সরাসরি পাঠানো হয়েছে। আরও ৫,০০০ আবেদন ভেরিফিকেশনের অধীনে রয়েছে। এছাড়া নন্দীগ্রামের হরিপুরে একটি নতুন অগ্নিনির্বাপক কেন্দ্র (দমকল কেন্দ্র)-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে তীব্র আক্রমণ
নন্দীগ্রামের পরিকাঠামোগত পিছিয়ে পড়ার জন্য সরাসরি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল জমানার শেষ পাঁচ বছরের শাসনকালকে কাঠগড়ায় তোলেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২১ সালের নির্বাচনে তাঁর কাছে পরাজিত হওয়ার পর রাজনৈতিক হিংসা ও আক্রোশের বশে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নন্দীগ্রামের সমস্ত উন্নয়নমূলক কাজ স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, রেল প্রকল্পের জন্য সামান্য ৬ একর জমির প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তৎকালীন তৃণমূল সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে সেই জমিও রেলকে হস্তান্তর করেনি।
তবে রাজনীতির সমীকরণ সরিয়ে রেখে নিজের বর্তমান দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘ভোট দেননি তো কী হয়েছে, আমি সবার মুখ্যমন্ত্রী। নন্দীগ্রাম ভাল থাকলে তবেই আমি ভাল থাকব।’’ আগামী উপনির্বাচনে নন্দীগ্রামের মানুষ যে উন্নয়নকেই হাতিয়ার করে বিজেপিকে রেকর্ড ব্যবধানে জয়ী করবেন, রেয়াপাড়ার সভা থেকে সেই আত্মবিশ্বাসই ব্যক্ত করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।
