বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

আদালতের নির্দেশ অমান্য করায় মমতার বিরুদ্ধে জোড়া এফআইআর-এর নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

29 August, 2026 2:59 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদন : মমতার সভা ঘিরে ফের তুঙ্গে রাজ্য রাজনীতির পারদ।

হাইকোর্টের কড়া নির্দেশের তোয়াক্কা না করে রাস্তা অবরুদ্ধ করা, নির্ধারিত সময়সীমা লঙ্ঘন এবং পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের পথেই হাঁটছে রাজ্য প্রশাসন। হেস্টিংস থানায় ইতিমধ্যেই তৃণমূল নেত্রী এবং  অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) একাধিক ধারায় স্বতঃপ্রণোদিত এফআইআর দায়ের করেছে কলকাতা পুলিশ। ক্যাথিড্রাল রোডে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (টিএমসিপি) প্রতিষ্ঠা দিবসের সভা থেকে খোদ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিচারবিভাগীয় নির্দেশ লঙ্ঘন করেছেন, এই অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করার পাশাপাশি পুলিশকে সরাসরি এফআইআর দায়ের করার নির্দেশ দিয়েছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনি লড়াই এবং রাজপথের কৌশলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার যে রূপরেখা নবান্ন ও পুলিশ প্রশাসন তৈরি করেছিল, তা থেকে এক চুলও সরতে নারাজ বর্তমান শাসকদল। শুক্রবারের ঘটনাপ্রবাহে আরও একবার স্পষ্ট, কালীঘাট শিবিরকে এতটুকু রেয়াত করতে প্রস্তুত নয় নবান্ন।

কী ঘটেছিল ক্যাথিড্রাল রোডে?

কলকাতা হাইকোর্টের দেওয়া নির্দিষ্ট শর্তাবলী মেনে শুক্রবার ক্যাথিড্রাল রোডে টিএমসিপি-র প্রতিষ্ঠা দিবসের সভার আয়োজন করেছিল কালীঘাট শিবির। হাইকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, ক্যাথিড্রাল রোডের উত্তরমুখী লেন বা অন্তত একটি ফ্ল্যাঙ্ক সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও যান চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ খোলা রাখতে হবে। একইসঙ্গে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টের মধ্যে সভা শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং সমাবেশে সমর্থক সংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা ১৫০০-এ বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু অভিযোগ, দুপুর গড়াতেই সেই সমস্ত শর্ত হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সভা চলাকালীন মঞ্চে উপস্থিত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হঠাৎই রাস্তার অপর প্রান্তে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মী-সমর্থকদের দিকে ইশারা করেন। তাঁর সেই প্ররোচনামূলক ইশারার পরপরই উত্তেজিত জনা ব্যারিকেড ভেঙে হুড়মুড়িয়ে মূল রাস্তার ওপর চলে আসে এবং মঞ্চের সামনের অংশ দখল করে। ফলে নিমেষের মধ্যে ক্যাথিড্রাল রোডের দুটি লেনই সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। থমকে যায় বাস, অ্যাম্বুলেন্সসহ সমস্ত জরুরি ও সাধারণ গণপরিবহন।

পুলিশের কাজে বাধা ও ধস্তাধস্তি

আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী একটি লেন খোলা রাখতে পুলিশ সেখানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযোগ, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর আশকারা পেয়ে কর্মী-সমর্থকরা ডিউটিতে থাকা পুলিশকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়ে এবং সরকারি কাজে বাধার সৃষ্টি করে। বিকেল ৩টে পার হয়ে যাওয়ার পরেও সভার মাইক বন্ধ করা হয়নি এবং কর্মসূচি নির্ধারিত সময়ের অনেক পর পর্যন্ত চালানো হয়। সমগ্র পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং হাইকোর্টের নির্দেশ ভাঙার অভিযোগে হেস্টিংস থানায় মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া বার্তা

ঘটনার খবর পাওয়ার পরেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কলকাতা পুলিশের শীর্ষ নেতৃত্বকে অবিলম্বে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “দেখলেন তো আজকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কীভাবে হাইকোর্টের অর্ডার ভাঙলেন ! আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল রাস্তার একটি ফ্ল্যাঙ্ক ছেড়ে সভা করতে হবে। কিন্তু তিনি কী করলেন? একদম গাছের নিচে থাকা লোকজনকে ডেকে, ইশারা করে রাস্তা বন্ধ করালেন। আইন সবার জন্য সমান। উনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলে আইনের ঊর্ধ্বে নন। আমি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি অবিলম্বে এফআইআর রেজিস্টার করতে। একইসঙ্গে ওঁর বিরুদ্ধে এই আদালত অবমাননার জন্য হাইকোর্টে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”

প্রশাসন ও ওয়াকিবহাল মহলের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর বাসভবন বা রাজনৈতিক আঙিনায় আটকে রাখার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি যখনই জনসমক্ষে নামার চেষ্টা করছেন, তখনই তাঁর বিরুদ্ধে আইনি আইনের বাঁধুনি আরও শক্ত করা হচ্ছে। আদালতের তোয়াক্কা না করার এই পুরনো অভ্যাসকে হাতিয়ার করেই এবার তাঁকে আইনি ফাঁদে জোর ধাক্কা দিতে চাইছে নবান্ন।

আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

প্রসঙ্গত, টিএমসিপি-র প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপনের অনুমতি চেয়ে আদালতে মুখোমুখি আবেদন জানিয়েছিল কালীঘাট এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দুই ভিন্ন শিবির। হাইকোর্ট ঋতব্রত শিবিরকে রানি রাসমণি রোডে এবং কালীঘাট শিবিরকে ক্যাথিড্রাল রোডে শর্তসাপেক্ষে সভা করার অনুমতি দেয়।

ক্যাথেড্রাল রোডের বিশৃঙ্খলার ঘটনায় তীব্র সুর চড়িয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তিনি বলেন, “হাইকোর্ট কত লোক নিয়ে সভা করা যাবে, তা পরিষ্কার বলে দিয়েছিল। অথচ সেখানে দাঁড়িয়ে খোদ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ব্যারিকেড ভেঙে রাস্তা দখল করতে সমর্থকদের প্ররোচিত করলেন! এই ধরণের আইন অমান্য করা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মানসিকতা ওঁর ডিএনএ-তে রয়েছে, যা থেকে উনি চট করে বেরিয়ে আসতে পারছেন না।”

সব মিলিয়ে, আদালতের রায় অমান্য করা এবং পুলিশের ওপর হামলার এই ঘটনায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বস্তি যে বহুগুণ বাড়ল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হেস্টিংস থানার এফআইআর এবং হাইকোর্টে দায়ের হতে চলা আদালত অবমাননার মামলায় আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee