নেপালের বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা ৩৫০ পেরিয়ে গেল, আগামী ৭২ ঘণ্টায় ফের হড়পা বানের পূর্বাভাস ?
কাঠমাণ্ডু: প্রকৃতির প্রলয়লীলায় বিপর্যস্ত নেপাল। দেশজুড়ে হাহাকার।
এখনও খোঁজ মেলেনি ১৪৩ জন ভারতীয়ের। সব মিলিয়ে নিখোঁজ প্রায় ১ হাজারের কাছাকাছি। নেপাল সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত মোট ২৭০টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সে দেশের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, নিখোঁজ ভারতীয়দের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রী। যার মধ্যে ছিল কলকাতার ৩২ জনের একটি দল এবং তামিলনাডুর ৩৭ পর্যটক। এদের কারোরই সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
নেপালের পর্যটন মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, বিপর্যয়ের পর অন্তত ৪০৩ জন পর্যটকের কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি। নিখোঁজ বিদেশিদের তালিকায় ভারত ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আমেরিকার নাগরিকদের নাম রয়েছে। প্রশাসনের আশঙ্কা আগামী ২৪ ঘণ্টায় মৃত ও নিখোঁজের তালিকা আরও বাড়তে পারে। বিদেশমন্ত্রী জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ ধংস হয়ে গিয়েছে তিব্বত সীমান্তের শহর রাসুয়া। নদীর দুপারে প্রায় ৫০ হাজার বাসিন্দার এই জনপদটি একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাদার স্তূপ সরিয়ে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে সেনাবাহিনী।
কীভাবে হল এই ভয়াবহ হড়পা বান?
বুধবারের রোদ ঝলমলে সকাল কীভাবে আচমকা সর্বগ্রাসী জলের স্রোতে ভেসে গেল? প্রাথমিক উপগ্রহ চিত্র থেকে এর কিছুটা ধারণা মিলেছে বলে জানা গেছে। তবে বিস্তারিত রিপোর্ট এখনও প্রকাশ করেনি বলেন্দ্র শাহের সরকার। এদিকে নেপালের বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর জানিয়েছে, এদিন চীন–নেপাল সীমান্তবর্তী এলাকায় ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। যার ফলে হিমবাহ ভেঙে যায়। ভেঙে যাওয়া সেই দানবীয় হিমবাহই প্রাথমিকভাবে আটকে দেয় লেহেন্দে খোলা নদীর গতিপথ।
পরে সেই গলে যাওয়া বরফের স্রোত নেমে আসে নদীর বুকে এবং দুরন্ত গতিতে বয়ে চলতে শুরু করে। যাত্রাপথে স্রোতের গতিবেগ আরও বাড়তে থাকে। জল–কাদার স্রোত বয়ে যায় ভোটেকোশী নদীতে। বয়ে চলা সেই স্রোতই ভয়াবহ আকার নেই রাসুয়া জেলায় গিয়ে। মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ঘরবাড়ি, মানুষজন, জিনিসপত্র।
অন্যদিকে আমেরিকার ভূতত্ত্ব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে জানিয়েছে, বুধবার কোনও ভূমিকম্পই হয়নি নেপালে। আসলে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নেমে এসে নদীতে ‘ডেব্রিস ফ্লো’ তৈরি করে। তার জেরেই আচমকা ভয়াবহ হড়পা বান চলে আসে। এই ধস থেকে তৈরি শক্তিশালী কম্পনই পরে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।
আমেরিকার প্ল্যানেট ল্যাবের উপগ্রহ চিত্রে ধরা পড়েছে, বরফ ও পাথর নিয়ে পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়েছিল। সেই ধসের ফলে বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা, বরফ ও জল নেমে আসে লেহেন্দে নদীতে। নদীটি চীন থেকে নেপালে বয়ে চলা ভোটেকোশি নদীর একটি উপনদী।
এদিকে নেপালের এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে দেশে একতা বজায় রাখার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ। একটি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টে তিনি লিখেছেন, এই সময়ে মানুষের প্রাণ বাঁচানোটাই প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত। এমন বিপর্যয়ের সময় সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জনগণকে ধৈর্য্য রাখার অনুরোধ জানিয়ে বলেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, ‘এই কঠিন সময়ে আপনারা একা নন। দেশ নিজের সবটুকু নিয়ে আপনাদের পাশে রয়েছে।’
বুধবারই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা হয়েছে বলেন্দ্র শাহর। এই বিপর্যয়ে নেপালের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন মোদি। নেপালের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ত্রাণ পাঠাচ্ছে ভারতও। প্রস্তুত হয়েছে বায়ুসেনার বিমান। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ভারতের পাঠানো ত্রাণ নেবেন তো সে দেশের মানুষ? কারণ, ২০১৫ সালে নেপালের ভূমিকম্পের পরও ত্রাণ পাঠিয়েছিল ভারত।
কিন্তু সেই সাহায্য নিতে অস্বীকার করেছিল সে দেশের জনগণের একটি অংশ। এবারও কি সেরকম কিছু ঘটতে পারে? এদিকে ভারতের পাঠানো ত্রাণ নিয়ে একটি কথাও খরচ করেননি বলেন্দ্র শাহ। তবে তাঁর দল আরএসপির মুখপাত্র জগদীশ খাড়েল মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, ভারত এবং অন্যান্য প্রতিবেশীদের সাহায্য নেপালের পক্ষে অত্যন্ত জরুরি।
