রংপুরের খুন শিক্ষক পরিবারের চার জন, গ্রেফতার দুই প্রতিবেশি !
ঢাকা : বাংলাদেশের রংপুরে নিজের বাড়ি থেকে একই পরিবারের চারজনের পোড়া ও বিকৃত দেহ উদ্ধারের ঘটনায় সামনে এল শিউরে ওঠার মতো তথ্য। অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুলশিক্ষক এবং তাঁর পুরো পরিবারকে খুন করে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ উঠল প্রতিবেশি দুই যুবকের বিরুদ্ধে। ঘটনায় দু জনকেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, ওই শিক্ষকের বাড়ির ছাদে উঠে রোজ রাতে নেশা করত অভিযুক্ত দুই যুবক। তাদের বাধা দেওয়াই কাল হল বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করছেন তদন্তকারীরা। ধৃতদের থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ওই পরিবারের সোনার গহনাও।
রংপুরের মাছয়াপাড়া এলাকায় নিজেদের দোতলা বাড়ি থেকে গত শনিবার উদ্ধার করা হয় গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) এবং ১২ বছর বয়সী ছোট ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মৃতদেহ। চারজনের মুখে কোনও দাহ্য পদার্থ দিয়ে পুড়িয়ে বিকৃত করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে চেনা না যায়।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমকে জানান, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে সিদ্ধার্থ দাস (১৯) এবং মুগ্ধ দাস (২৩)-কে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজেদের দোষ স্বীকার করেছে।
পুলিশের তদন্তে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নেশার টানে চুপিচুপি গণপতি চক্রবর্তীর দোতলা বাড়ির ছাদে ওঠে। উদ্দেশ্য ছিল নির্বিঘ্নে নেশা করা। কিন্তু ছাদে অস্বাভাবিক শব্দ পেয়ে তা পরীক্ষা করতে ওপরে যান গণপতিবাবু। ছাদে প্রতিবেশীদের এই কাণ্ড দেখে তিনি প্রতিবাদ জানান। কিন্তু সেই প্রতিবাদই তাঁর জন্য কাল হয়। অভিযোগ, গণপতিবাবুর কাঁধে থাকা গামছা কেড়ে নিয়ে তা দিয়েই পেঁচিয়ে তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে দুই যুবক।
স্বামীকে খুঁজতে ওপরে উঠে সিঁড়িতেই আক্রমণের শিকার হন প্রীতিলতা দেবী। তাঁকেও একই কায়দায় হত্যা করা হয়। এর পর চিৎকার শুনে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন ২৩ বছরের তরুণী কন্যা আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী। অভিযুক্তরা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বেশ কয়েক মিনিট ধস্তাধস্তির পর তরুণীকে দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। শেষে কেবল ১২ বছরের শিশু প্রিয়ম অবশিষ্ট ছিল। অভিযুক্তরা ভয় পেয়ে যায় যে শিশুটি বেঁচে থাকলে তাদের চিনে ফেলবে এবং পরিচয় ফাঁস করে দেবে। তাই নিষ্পাপ শিশুটি দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে প্রাণভিক্ষা চাইলেও তাকেও নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের হতবাক করে দিয়েছে ঘাতকদের চরম নিষ্ঠুরতা ও ঠাণ্ডা মাথার মানসিকতা। চারজনকে খুনের পর তারা পালিয়ে যায়নি। পুলিশ কমিশনারের বরাতে জানা যায়, লাশগুলো ঘরে রেখেই ঘাতকরা সারারাত ওই বাড়িতে কাটায়। গ্রেফতার হওয়া সিদ্ধার্থ পেশায় একজন মাছ ব্যবসায়ী এবং মুগ্ধ একজন পেশাদার স্বর্ণকার। খুনের পর তারা ঘর থেকে সোনাদানা লুট করে নিয়ে যায়। এমনকি লুট করা সোনার চুড়ি আসল কি না, তা পরীক্ষা করতে তারা আগুন জ্বালিয়ে পরীক্ষা করারও চেষ্টা করেছিল বলে প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা খেজুরের বিচি থেকে অভিযুক্তদের ডিএনএ (DNA) পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে, যা মামলার অকাট্য প্রমাণ হিসেবে আদালতে পেশ করা হবে।
শান্ত ও মনোরম রংপুর শহরে একই পরিবারের চারজনকে এভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ঘটনায় সমগ্র বাংলাদেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও সংখ্যালঘুরা এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং দোষীদের কঠোরতম শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
