শারদীয়া পত্রিকার পাঠক কমছে কেন? সমস্যা কি লেখকের, না সময়ের?
দীপ্যমান দত্ত
একটা সময় ছিল, দুর্গাপুজো মানেই নতুন জামাকাপড়, পুজোর গান, মহালয়ার ভোর আর শারদীয়া পত্রিকা। পুজোর বাজারে নতুন জামার সঙ্গে হাতে আসত এক বা একাধিক পুজো সংখ্যা। কেউ উপন্যাসের জন্য অপেক্ষা করতেন, কেউ গল্পের জন্য, কেউ প্রবন্ধের জন্য। আর অনেকের কাছে পুজোর ছুটির সবচেয়ে বড় বিলাসিতা ছিল, একটা মোটা শারদীয়া নিয়ে নিরিবিলিতে বসে পড়া।
আজ সেই ছবিটা অনেকটাই বদলে গেছে। শারদীয়া পত্রিকা এখনও বেরোয়। বরং সংখ্যার বিচারে প্রকাশনার অভাব নেই। বড় প্রকাশনার পাশাপাশি অসংখ্য ছোট প্রকাশনী, লিটল ম্যাগাজিন এবং নতুন উদ্যোগ পুজো সংখ্যা প্রকাশ করছে। কিন্তু প্রশ্নটা অন্যত্র। কতজন পাঠক আগের মতো আগ্রহ নিয়ে সেগুলি কিনছেন?
সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশক ও বিক্রেতা এবং ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা থেকে যে ছবি উঠে আসছে, তাতে বিক্রি কমার বিষয়টি বাস্তব। কোথাও পুরনো শারদীয়া অবিক্রীত পড়ে থাকছে, কোথাও প্রকাশক পরের বছর সংখ্যা বের করবেন কি না তা নিয়েই সংশয়ে।
কিন্তু কেন এই পরিস্থিতি? শুধুই কি নামী লেখকের অভাব! সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠক বিবর্তন মল্লিক বললেন, নামী লেখকের অভাব নিঃসন্দেহে একটা কারণ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, রমাপদ চৌধুরী, মহাশ্বেতা দেবী, বিমল কর, নবারুণ ভট্টাচার্য, দেবেশ রায়দের মতো লেখকদের ঘিরে যে পাঠক-উন্মাদনা তৈরি হতো, তার পুনরাবৃত্তি সহজ নয়। কিন্তু এছাড়াও কারণ আছে। অনেকগুলি গল্প কিংবা উপন্যাস পড়ার পর মনে হচ্ছে, এত শব্দের উজান বেয়ে এসেও কই মন তো ভরল না তো!
শারদীয়া একসময় শুধু একটি পত্রিকা ছিল না, সেটি ছিল বাংলা সাহিত্যের বার্ষিক উৎসবও। একটি পুজো সংখ্যায় প্রকাশিত উপন্যাস নিয়ে পাড়ার আড্ডায় আলোচনা হতো। কফিহাউসে তর্ক হতো। পাঠক পরের বছর সেই লেখকের নতুন লেখা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতেন। অর্থাৎ লেখকের নাম এবং তাঁদের লেখার মান ছিল পত্রিকার বিক্রয়ের অন্যতম কারণ। কিন্তু আজকের সংকটকে শুধু ‘সুনীল নেই, শীর্ষেন্দু নেই’ বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। কারণ নতুন লেখক তো আছেন। প্রচুর লেখক আছেন। লেখার পরিমাণও কমেনি। তাহলে? আসলে আজকের লেখক প্রচুর লিখলেও পাঠকের কাছে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করতে পারেননি।
দ্বিতীয় সমস্যা হল, শারদীয়া কি সত্যিই ‘ইভেন্ট’ থাকছে? একসময় শারদীয়ার জন্য লেখা মানেই লেখকের কাছে একটা বিশেষ প্রস্তুতি। সম্পাদকও জানতেন, বছরের সেরা লেখাগুলির একটি অংশ শারদীয়ার জন্য তুলে রাখতে হবে। ফলে শারদীয়া শুধু অর্ডার ও সাপ্লাইয়ের বাজার ছিল না, ছিল সৃষ্টিশীল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণেও এই পরিবর্তনের দিকে আঙুল তোলা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শব্দসংখ্যায় লেখা সরবরাহ, প্রচুর উপন্যাসের চাহিদা এবং দ্রুত প্রকাশের চাপ কনটেন্টের মানকে প্রভাবিত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ অভিযোগ তুলে বলছেন, কনটেন্ট দুর্বল হয়েছে।
গৃহবধূ চিরশ্রী চৌধুরী বললেন, অতটা নিরাশ হওয়ার মতো সময় আসেনি। এখনও ভালো লেখা হচ্ছে, তবে আগের তুলনায় সংখ্যাটা কম। নতুন লেখক আসছেন, নতুন বিষয় নিয়ে কাজ হচ্ছে। তবে গড় মান যে কমেছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
আই টি কর্মী প্রাণেশ মজুমদার বললেন, আজকে একটা শারদীয়ার দাম আড়াইশো, তিনশো এমনকী পাঁচশো টাকাও আছে। আমি জানি না, চার-পাঁচশো পাতার বইতে ভালোলাগার মতো কী কী কনটেন্ট আছে। তবু কিনছি। কিন্তু কেনার পর দেখলাম আমার প্রপ্তির ঘর দশ শতাংশ পূর্ণ হয়েছে। পরপর কয়েক বছর এমন হলে একজন পাঠকের মধ্যে একটা স্থায়ী হতাশা জন্মাতে পারে এবং তিনি শারদীয়া সংখ্যা কেনার ব্যাপারে সঙ্কুচিত হবেন। যিনি চারটে কিনতেন, তিনি দুটো কিনবেন। যিনি দুটো কিনতেন তিনি একটা কিনবেন।
উঠতি কবি দিগ্বিজয় গুহ বললেন, ভালো লেখা ছাপা হলে পাঠক আবার শারদীয়া পত্রিকা কিনবেন। দাম হয়তো বেড়েছে, কিন্তু লেখাতে যদি মন ভরে তবে পাঠক কিনবেনই। ইদানীং অনেক নতুন পত্রিকা এসেছে। সেগুলি বড় হাউসের পত্রিকাগুলির সঙ্গে রীতিমতো টক্কর দিচ্ছে। অর্থাৎ সেগুলির কন্টেন্টে পাঠকের মন ভরছে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কেয়া ভট্টাচার্য বললেন, প্রতিটি শারদীয়ার আমরা সবকিছু পাই। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ। কিন্তু নেই লেখাগুলোর মধ্যে প্রাণ। পাঠকদের কিন্তু ভঙ্গী দিয়ে চোখ ভোলানো যাবে না।
লেখক হীরক ভদ্র বললেন, আজকের পাঠকের হাতে আগের তুলনায় প্রচুর কনটেন্ট। ফেসবুক, ইউটিউব,ওটিটি, রিলস, পডকাস্ট, ডিজিটাল নিউজ, ই-বুক। সব মিলিয়ে মানুষের অবসর সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে হাজার হাজার কনটেন্ট। আগে একজন পাঠকের সামনে বিকল্প ছিল সীমিত। ফলে একটি মোটা পুজো সংখ্যা হাতে নিয়ে ১০০-২০০ পৃষ্ঠা পড়ে ফেলা খুব স্বাভাবিক ছিল। আজ একজন পাঠক একই সময়ে দশটি জিনিস করতে পারেন। অর্থাৎ শারদীয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য কোনও বাংলা পত্রিকা নয়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী গোটা ডিজিটাল বিনোদন ব্যবস্থা। এই পরিবর্তনের সঙ্গে শারদীয়া কতটা পাল্লা দিতে পারছে, সেটাই আসল প্রশ্ন।
কারণ যা-ই হোক না কেন, যোগ্যতমের উদ্বর্তনই যে মূল কথা সেটা তো আমরা জানি। এই সহস্র কন্টেন্টের বাজারে ভালো কন্টেন্ট দিতে না পারলে শারদীয়া পত্রিকার বিক্রি কমবেই।
