বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

পয়সা দিয়ে খাবার কিনতে চাই, ভাগাড়ের আবর্জনা নয়

07 September, 2026 4:18 PM UTSAB RC
শেয়ার করুন

খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষ্যে রাজ্যজুড়ে অভিযানে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা কোনও বিচ্ছিন্ন অনিয়মের ছবি নয়। বরং এই অভিযান যেন আমাদের সামনে তুলে ধরেছে খাদ্য ব্যবস্থার এক ভয়াবহ পচন। ফুটপাতের সামান্য দোকান থেকে শুরু করে নামী-দামি রেস্তোরাঁ— সর্বত্র যদি পচা মাছ, নষ্ট মাংস, বাসি ও অস্বাস্থ্যকর মিষ্টি এবং মানুষের খাওয়ার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত খাদ্যসামগ্রী উদ্ধার হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। ক্ষুব্ধ মানুষ প্রশ্ন করবেন, এতদিন প্রশাসন কোথায় ছিল?

আরও বড় প্রশ্ন, এতদিন আমরা কী খেয়ে বেঁচে আছি? সাধারণ মানুষ কোনও দোকানে খাবার কিনতে গেলে ধরে নেন, দোকানটি বৈধ, খাবারটি বিক্রির উপযুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তার গুণমানের উপর নজর রাখছে। এই বিশ্বাসটাই একটি সভ্য খাদ্যব্যবস্থার ভিত্তি। কিন্তু অভিযানে একের পর এক যে ছবি সামনে আসছে, তাতে সেই বিশ্বাসটাই ভেঙে যাচ্ছে।

মানুষ পয়সা দিয়ে খাবার কিনছেন। সেই খাবারের মধ্যে যদি পচা মাছ, নষ্ট মাংস কিংবা অখাদ্য উপকরণ মিশে থাকে, তবে এটি শুধু ব্যবসায়ীর অসততা নয়, এটি মানুষের সঙ্গে প্রতারণা। আর সেই প্রতারণা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে প্রশাসনিক নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতেই হবে।

কারণ অসাধু ব্যবসায়ী একদিনে তৈরি হয় না। নজরদারির অভাবই তাকে সাহসী করে। একটি দোকানে দু’দিন, পাঁচ দিন বা দশ দিন নষ্ট খাবার রাখা হল। প্রশাসনের কেউ জানতে পারল না। একটি রেস্তোরাঁয় দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের বা পচা খাদ্যসামগ্রী ব্যবহার হল। কেউ পরীক্ষা করলেন না। মিষ্টির দোকানে খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ উঠল। নিয়মিত পরিদর্শন হল না। তাহলে লাইসেন্স দেওয়ার পর প্রশাসনের কাজ কি শেষ? ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়াই কি নজরদারির শেষ ধাপ?

যদি তাই হয়, তাহলে খাদ্য সুরক্ষা আইন রেখে লাভ কী? বিশেষ অভিযানে গিয়ে যদি এত বিপুল পরিমাণ অখাদ্য খাদ্যসামগ্রী উদ্ধার হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। এই অভিযান যদি না হতো, তাহলে এই খাবারগুলো কোথায় যেত?

উত্তরটা ভয়ঙ্কর। মানুষের পাতে। অর্থাৎ, যে খাবার মানুষের খাওয়ার উপযুক্ত নয়, সেটিই হয়তো পরদিন রান্নাঘরে ঢুকত, রান্না হতো, সুন্দর করে প্লেটে সাজানো হতো এবং আমরা তার জন্য টাকা দিতাম। বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে খাবারের ভিতরের পচন বোঝার কোনও উপায় নেই সাধারণ মানুষের। সে কারণেই খাদ্য নিরাপত্তার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে প্রশাসন ও খাদ্য ব্যবসায়ীদের উপর।

এই মৌলিক দায়িত্বে কোথাও গাফিলতি থাকলে তার মূল্য কিন্তু প্রশাসনকে দিতে হয় না, দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। অসুস্থ হয় একটি পরিবার। চিকিৎসার খরচ বাড়ে। কর্মদিবস নষ্ট হয়। শিশুরা অসুস্থ হয়। প্রবীণরা বিপদে পড়েন। আর সবচেয়ে বড় কথা, খাদ্যে ভেজালের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেক সময় সঙ্গে সঙ্গে বোঝাও যায় না। তাই পচা খাবার উদ্ধার করে ফেলে দেওয়া এবং দু’-চারজন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করলেই প্রশাসনের দায় শেষ হতে পারে না।

অনেকগুলি প্রশ্ন উঠে আসে। যে দোকান থেকে আজ পচা খাবার উদ্ধার হল, সেখানে গত এক মাসে কতবার পরিদর্শন হয়েছে? গত ছ’মাসে কতবার হয়েছে? সেই দোকানের খাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা কে পরীক্ষা করেছে? লাইসেন্স কীভাবে দেওয়া হয়েছিল? অভিযোগ থাকলে তার নিষ্পত্তি কীভাবে হয়েছে?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর সাধারণ মানুষ জানতে চান। কারণ অভিযান হলেই সংবাদ হয়। কিন্তু অভিযান কেন করতে হল, সেটাই আসল প্রশ্ন। প্রশাসনের নজরদারি যদি নিয়মিত ও কার্যকর হতো, তাহলে বিশেষ সপ্তাহে অভিযান চালিয়ে এত চমকপ্রদ অনিয়ম প্রকাশ্যে আসার অপেক্ষা করতে হতো না। খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহ যেন প্রশাসনের বার্ষিক আত্মপ্রদর্শনের অনুষ্ঠান না হয়ে ওঠে। সারা বছর কোথায় ছিল নজরদারি, তারও হিসাব দিতে হবে।

আর শুধু ছোট দোকানকে টার্গেট করলেই হবে না। রাস্তার ধারের সস্তা খাবারের দোকানে যেমন অভিযান চলবে, তেমনই বড় রেস্তোরাঁ, অভিজাত হোটেল, নামী মিষ্টির দোকান, ক্যাটারিং সংস্থা— সর্বত্র একই মাপকাঠিতে পরীক্ষা করতে হবে। কেননা আইনের চোখে খাবারের দাম বড় বা ছোট নয়। নিরাপত্তার প্রশ্নে সবাই সমান। প্রশাসনের কাছে আমাদের আরও একটি প্রত্যাশা আছে, অভিযান যেন লোকদেখানো না হয়। আজ অভিযান হল, কয়েকটি পচা খাবার উদ্ধার হল, ছবি উঠল, সংবাদ হল, তারপর সব আগের মতো, এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া দরকার।

এই অবস্থায় প্রয়োজন নিয়মিত, আকস্মিক এবং ধারাবাহিক অভিযান। প্রয়োজন পরীক্ষাগারে নমুনা পাঠানো, রিপোর্ট প্রকাশ করা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া। কোনও প্রতিষ্ঠান বারবার একই অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা হওয়া উচিত। আর প্রশাসনের মধ্যেও যদি কেউ কর্তব্যে গাফিলতি করেন, তাঁর বিরুদ্ধেও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একজন অসাধু ব্যবসায়ী পচা খাবার বিক্রি করে যতটা অপরাধ করেন, একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক চোখ বন্ধ করে থাকলে তিনিও জনস্বাস্থ্যের প্রতি তাঁর দায়িত্ব পালন করেন না।

এই মুহূর্তে তাই খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল, খাবারের মান নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার আগে প্রশাসনকে নিজের নজরদারির মান বাড়াতে হবে। তাই এই অভিযান বন্ধ করা যাবে না। বরং আরও বাড়াতে হবে। জেলা থেকে মহকুমা, শহর থেকে গ্রাম, বড় রেস্তোরাঁ থেকে ছোট খাবারের দোকান— সর্বত্র নজরদারি চাই। আমরা খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহ নয়, খাদ্য সুরক্ষা চাই ৩৬৫ দিন। আমরা পয়সা খরচ করে ভালো খাবার কিনতে চাই, ভাগাড়ের আবর্জনা নয়।

 

প্রতিবেদন

UTSAB RC