সরকার বদলেছে, তোলাবাজির আতঙ্ক বদলায়নি
সাগর থেকে পাহাড়। একসময় চলত একচেটিয়া তোলাবাজি। জোড়াফুলের নেতারা নির্বিচারে তোলাবাজি চালাতেন। তার ফলও মিলেছে। বাংলার মানুষ একযোগে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। তোলাবাজি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছে। কিন্তু দেখা গেল স্বভাব বদলায়নি। দেখেশুনে একটা প্রবাদের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। প্রবাদটা হল, টকের জ্বালায় পালিয়ে এলাম তেঁতুলতলায় বাসা। কেন এমন কথা মনে হল?
আসলে সরকার বদলেছে। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু তোলাবাজি ও হুমকি-ভয় দেখানোর অভিযোগ যেন এখনও পিছু ছাড়েনি। বরং নতুন সরকারের আমলেও এই অভিযোগ ঘিরে মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। চারমাস পেরোতে না পেরোতেই তোলাবাজির মহামারী সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছে।
বিরোধী শিবিরে থাকার সময় তোলাবাজির বিরুদ্ধে সরব ছিলেন বিজেপির একাধিক নেতা। সরকার পরিবর্তনের পরেও দলের অন্দরে বারবার সতর্কবার্তা এসেছে। শমীক ভট্টাচার্য থেকে শুভেন্দু অধিকারী সকলেই বুঝেছিলেন প্রথম থেকে সাবধান না হলে গেল গেল রব উঠবে। সরকারে থাকলে তোলাবাজির হাজার সুবিধা, সেটা সকলেই জানেন। সেই আশঙ্কার কথা মাথায় রেখেই দলের নেতারাই প্রকাশ্যে বার্তা দিয়েছেন, কোনওভাবেই তোলাবাজি, সিন্ডিকেট কিংবা সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের সংস্কৃতি বরদাস্ত করা হবে না।
ওমা, কে শোনে কার কথা! সেই নিষেধাজ্ঞাকে আমল না দিয়ে বিজেপির নিচুতলার নেতারা উৎসবের মেজাজে নেমে পড়েছেন টাকা আদায়ের খেলায়। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ী, দোকানদার এমনকী হাটবাজারের ব্যাপারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ঘন ঘন অভিযোগ আসছে সল্টলেকের বিজেপি পার্টি অফিসে।
অভিযোগ উঠছে, কোথাও ব্যবসায়ীকে চাপ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও নির্মাণকাজ বা স্থানীয় ব্যবসাকে কেন্দ্র করে টাকা চাওয়ার অভিযোগ উঠছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ের জোরে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসছে। ফলে মানুষের একাংশের প্রশ্ন, সরকার বদলালেও যদি একই ধরনের আতঙ্ক থেকে যায়, তাহলে পরিবর্তনের মানে কী রইল? তোলাবাজির সেই ট্রাডিশন কি সমানে চলেই যাবে?
রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ে। মানুষ ব্যবসা করবে, কাজ করবে, নিজের উপার্জনের টাকা নিজের মতো করে ব্যবহার করবে। তার জন্য কোনও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিকে ভয় পেতে হবে কেন? তোলাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা শুধু রাজনৈতিক মঞ্চে বললেই হবে না, তাকে কার্যকর করতে হবে। অভিযোগ উঠলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ তোলাবাজির মধ্যে শুধু অর্থের প্রশ্ন থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভয়, প্রশাসনের উপর আস্থা এবং নাগরিকের নিরাপত্তাবোধ। সেই সঙ্গে জড়িয়ে থাকে উন্নয়নের প্রশ্ন। তোলাবাজির অভ্যাস যদি একবার লাগামছাড়া হয়ে যায়, তখন পার্টির নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে ওঠে।
সরকার বদলেছে। এখন মানুষের প্রত্যাশা, আতঙ্কের রাজনীতিটাও বদলাক। সতর্কবার্তা নয়, এবার চাই বাস্তব পদক্ষেপ। নইলে প্রশ্ন উঠতেই থাকবে, সরকার বদলেছে, তোলাবাজির আতঙ্ক বদলায়নি কেন? ধীরে ধীরে মানুষের গুস্সা বাড়বে। তাতে সরকারের ভাবমূর্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যে আশায় মানুষ নতুন সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে, তা যদি ব্যর্থ হয়, তবে সরকারি মলম লাগিয়ে কোনও কাজ হবে না। মানুষ দেখতে চায়, তোলাবাজির বিরুদ্ধ নেতা ও মন্ত্রীরা যে তর্জন-গর্জন করছেন, তা যেন তোলাবাজি বন্ধ করতে সফল হয়। নাহলে সবটাই হয়ে দাঁড়াবে বজ্র অআঁটুনি ফস্কা গেরো।
