কাঁচা পরোটা পরিবেশন করে চরম বিপদ! বন্দে ভারতে ২ লাখ টাকার মাশুল গুনল ক্যাটারার
নয়াদিল্লি : ভারতীয় রেলের মুকুটে অন্যতম সেরা পালক ‘বন্দে ভারত এক্সপ্রেস’। গতি, বিলাসিতা এবং আধুনিকতার মেলবন্ধনে এই ট্রেন ইতিমধ্যেই যাত্রীদের মন জয় করেছে। কিন্তু সেই আভিজাত্যের ট্রেনেই পরিবেশন করা হলো আধসেদ্ধ বা কাঁচা পরোটা! আর এই এক প্লেট কাঁচা পরোটার চরম মাশুল গুণতে হলো ট্রেনের খাবার সরবরাহকারী সংস্থাকে। নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ক্যাটরারকে ২ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ক্যাটারিং অ্যান্ড ট্যুরিজম কর্পোরেশন (IRCTC)।
একইসঙ্গে খাবারের গুণমান বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ার অপরাধে এবং রান্নাঘরে সঠিক নজরদারি না চালানোর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী এজেন্সির বিরুদ্ধেও কড়া ব্যবস্থা নিয়েছে রেল। গাফিলতির অভিযোগে ওই ফুড সেফটি এজেন্সির ওপর ২০ হাজার টাকার জরিমানা চাপানো হয়েছে। এই নজিরবিহীন পদক্ষেপে রেলে খাবারের মান নিয়ে বিতর্ক ফের নতুন করে সামনে এসেছে।
রেল সূত্রে খবর, বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটেছে গত ১৬ আগস্ট বারাণসী থেকে নতুন দিল্লিগামী বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে (ট্যুর নম্বর ২২৪৩৫)। যাত্রা চলাকালীন এক যাত্রী অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে প্রাতরাশ অর্ডার করেছিলেন। কিন্তু তাঁর পাতে যে পরোটা দেওয়া হয়, তা একেবারেই সেদ্ধ হয়নি এবং খাওয়ার অযোগ্য ছিল। নিম্নমানের এই খাবার দেখে ক্ষুব্ধ হন ওই যাত্রী।
ঘটনাটি কেবল ট্রেনের অ্যাটেনডেন্টকে জানিয়েই খান্ত থাকেননি তিনি। তৎক্ষণাৎ আধসেদ্ধ পরোটার ছবি ও ভিডিও তুলে নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে পোস্ট করেন। নিজের অভিযোগে তিনি সরাসরি দেশের রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবকে ট্যাগ করেন এবং খাবারের নিম্নমান নিয়ে তোপ দাগেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই পোস্ট সামনে আসতেই হইচই পড়ে যায় রেলের প্রশাসনিক মহলে।
অভিযোগের গুরুত্ব অনুধাবন করে রেলের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা অবিলম্বে একটি তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তে দেখা যায়, যাত্রীর আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ সত্য ছিল এবং খাবার পরিবেশনে গুরুতর গাফিলতি করা হয়েছে। এর পরপরই ক্যাটারিং লাইসেন্সধারীর ওপর ২ লক্ষ টাকা জরিমানা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বন্দে ভারতের এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যার কিছুদিন আগেই দেশের সংসদে ট্রেনের খাবারের গুণমান নিয়ে মুখ খুলেছিলেন রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। রাজ্যসভায় কংগ্রেস সাংসদ চন্দ্রকান্ত হানডোরের এক লিখিত প্রশ্নের উত্তরে রেলমন্ত্রী ট্রেনের খাবার ও পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য পেশ করেন।
কংগ্রেস সাংসদ জানতে চেয়েছিলেন, অতিরিক্ত মূল্য আদায়, নিম্নমানের খাবার পরিবেশন কিংবা নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে কম খাবার দেওয়ার মতো ঘটনায় অভিযুক্ত আইআরসিটিসি (IRCTC) লাইসেন্সধারীদের বিরুদ্ধে রেল কী আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছে?
তার জবাবে লিখিতভাবে রেলমন্ত্রী জানান, “ইন্ডিয়ান রেলওয়ে গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৫৮ কোটি মিল বা খাবার পরিবেশন করে থাকে। তার মধ্যে খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ আসার হার অত্যন্ত কম—গড়ে মাত্র ০.০০০৮ শতাংশ। তবে যাত্রীদের সুবিধা নিশ্চিত করতে কোনো অভিযোগকেই হালকাভাবে নেওয়া হয় না। গত তিন বছরে আসা বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে দোষী সংস্থাগুলির কাছ থেকে মোট ৫.১৩ কোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।”
রেলমন্ত্রী সংসদে আরও জানান যে, দূরপাল্লার ট্রেনে খাবারের গুণমান, পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সুনিশ্চিত করতে একাধিক আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
-
নির্দিষ্ট বেস কিচেন ব্যবহার: ট্রেনগুলিতে যত্রতত্র থেকে খাবার তোলার বদলে নির্দিষ্ট এবং অনুমোদিত আধুনিক বেস কিচেন (Base Kitchen) থেকে খাবার সরবরাহ করার নিয়ম চালু হয়েছে।
-
আধুনিক রান্নাঘর নির্মাণ: দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন এবং জায়গায় বিশ্বমানের প্রযুক্তি সম্বলিত অত্যাধুনিক বেস কিচেন তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি হয়।
-
লাইভ নজরদারি: খাবার তৈরির প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি থাকছে কি না, তা সরাসরি দেখার জন্য বেস কিচেনগুলিতে সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা বসানো হয়েছে। দিল্লির কেন্দ্রীয় দফতর থেকে বা রেলের আধিকারিকরা যে কোনো সময় এই সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
-
কঠোর ফুড সেফটি অডিট: খাবার তৈরির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম কঠোরভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করতে নিরপেক্ষ থার্ড-পার্টি সেফটি এজেন্সিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে এত সব প্রযুক্তি এবং কড়া আইনি নিয়ম থাকা সত্ত্বেও বন্দে ভারতের মতো প্রিমিয়াম ট্রেনে কীভাবে কাঁচা পরোটা পরিবেশন করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ক্ষুব্ধ যাত্রীরা। এই ঘটনার পর স্পষ্ট যে, রেলে খাবারের মান নিয়ে বিন্দুমাত্র গাফিলতি বরদাস্ত করতে নারাজ রেল প্রশাসন। ভবিষ্যতে অন্য ক্যাটরাররা যাতে সচেতন হয়, তার জন্যই এই বিপুল অঙ্কের মাশুল চাপানো হলো বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
