বিরল খনিজকে অস্ত্র বানানো নিয়ে সতর্কবার্তা, মোদীর সঙ্গে সহমত চিন-রাশিয়াও
নয়াদিল্লি, ১৩ সেপ্টেম্বর: BRICS সম্মেলনে যোগ দেওয়া নেতাদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর কথায়, “প্রযুক্তি ও বিরল , গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ”-কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, যা এতদিন ধরে বিশ্ব যৌথ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে অর্জন করেছে, তা মুহূর্তে নষ্ট করে দিতে পারে। মোদির মতে, বর্তমান বিশ্বে কোনও সংকটই কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত BRICS সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে সকালে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উপস্থিতিতে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বজুড়ে যেভাবে একের পর এক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে, তার প্রভাব থেকে কোনও দেশই বাদ যাচ্ছে না। মোদি বলেছেন, “বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত সংঘাত তৈরি হচ্ছে, যার সরাসরি ও গুরুতর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। মহামারী, জলবায়ু বিপর্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিপর্যয় প্রমাণ করেছে যে আজকের পারস্পরিক সংযুক্ত বিশ্বে কোনও সংকটই একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না।”
যদিও প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট উদাহরণ উল্লেখ করেননি। সম্প্রতি আমেরিকা-ইরান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়। তাঁর ভাষণে পরোক্ষে উঠে আসে কোভিড-১৯ মহামারীর প্রসঙ্গও — যা গোটা বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল।
মোদি জানান, “তাই আমরা BRICS গোষ্ঠীর মধ্যে সহনশীলতা বাড়ানোর উপর বিশেষ জোর দিয়েছি। সময় মতো চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা, তার জন্য প্রস্তুত থাকা এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি আরও জানান, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও তার মোকাবিলায় একটি সমন্বিত পূর্ব-সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে BRICS সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, এবং এই সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের নির্দেশিকাও তৈরি হয়ে গেছে।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শোনার জন্য উপস্থিত ছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো। মোদি বলেন, “ভারতের সভাপতিত্বে আমরা চারটি স্তম্ভের উপর গুরুত্ব দিয়েছি — সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্ব। আপনাদের সহযোগিতা ও সমর্থনে আমাদের যৌথ লক্ষ্যকে একটি সম্যকজনক পরিস্থিতিতে রূপান্তরিত করতে পেরেছি, এটা আমার কাছে আনন্দের।”
ভাষণের আগে দিল্লির ভারত মণ্ডপমে নেতারা একটি গ্রুপ ছবির জন্য পোজ দেন। এদিনই দক্ষিণ আফ্রিকা, কাজাখস্তান, ফিলিপাইন, মিশর, বুরুন্ডি, উগান্ডা ও নাইজেরিয়ার নেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসার কথা প্রধানমন্ত্রীর।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, আগের দিন ঘোষিত ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’-এ মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ সংযম বজায় রাখা ও পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলার মতো পদক্ষেপ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই ঘোষণাপত্রে ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সংঘাতের স্থায়ী সমাধান হিসেবে দ্বি-রাষ্ট্র নীতির প্রতি BRICS-এর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে, পাশাপাশি প্যালেস্তাইনের প্রতি আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা আরও জোরদার করার আহ্বান এবং গাজায় মানবিক সাহায্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইজরায়েলের আইনি দায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে ঘোষণাপত্রে, পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান সংরক্ষণবাদী নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সতর্ক করা হয়েছে যে, খেয়ালখুশি মতো শুল্ক বৃদ্ধি এবং ‘পরিবেশ-বান্ধব’ তকমা দেওয়া বাণিজ্য বাধা বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর ক্ষতি করছে।
