নির্বাচন কমিশনের অন্দরের ঝড়ে গণতন্ত্র কি বিপন্ন?
অনেকে মনে করেন, ভারতের গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ভোটের দিনটি। তা অবশ্য নয়। তারও আগে থাকে ভোটার তালিকা সংশোধনের পর্ব। যোগ্য ভোটারের নাম তোলা এবং মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়াটা অবশ্য কর্তব্য। সেটিও গণতন্ত্রের একটি পদক্ষেপ। সেই কাজে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু এবারে দেশে SIRকে কেন্দ্র করে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছিলেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনের হাতে বিপন্ন গণতন্ত্র। তারপরে বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গে ভোট সম্পন্ন হয়।
এর পরই একটি সংবাদ প্রকাশ্য আসে। তাতে দেখা যায়, দুই নির্বাচন কমিশনার বারবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাজ নিয়ে অতীতে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এমনকী জ্ঞানেশ কুমারের কাজকে তাঁরা অসাংবিধানিক বলে চিহ্নিত করে চিঠিও দিয়েছিলেন। অনেকেই মনে করছেন, গণতন্ত্র রক্ষাকারী নির্বাচন কমিশনের ভিতরের এই দ্বন্দ্বে প্রমাণিত হয়ে গেল, এই মুহূর্তে ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত কতটা নড়বড়ে। তাই নির্বাচন কমিশনের অন্দরের সাম্প্রতিক মতবিরোধকে সাধারণ প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব খাটো করা হবে।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত দশ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার, সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া নিয়ে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের আপত্তির মধ্যে ছিল ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, Form 6-এর পরিবর্তন এবং ভোটারদের ডেটাবেসের ব্যবস্থাপনা ও কেন্দ্রীয়করণ পদ্ধতি নিয়ে।
অভিযোগগুলির সত্যতা, আইনি বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলির পূর্ণ প্রেক্ষাপট শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়, তা নিয়ে বিচার ও তদন্তের জায়গা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনের জবাবে বলেছে, কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি গত এক বছরে পূর্ণ কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন মতামত প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কাজকর্মরই অংশ।
নির্বাচন কমিশন কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠান নয়। সরকারও নয়, বিরোধী দলও নয়। তার দায়িত্ব হচ্ছে ভোটার, প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দল সকলের জন্য একই নির্বাচনী কাঠামো নিশ্চিত করা। তাই কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক ভাষণে নয়, নথি, আইন, তথ্য এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ভোটার তালিকার প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ ভোটার তালিকা কেবল একটি প্রশাসনিক নথি নয়। সেখানে একটি নাম থাকা মানে একজন নাগরিকের নির্বাচনী অংশগ্রহণের অধিকার কার্যকর থাকার অন্যতম পূর্বশর্ত।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, SIR-এর পরে বাদ যাওয়া ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ২২ লক্ষের বেশি ভোটার পুনর্বহালের জন্য আবেদন করেছেন। এই পরিসংখ্যান নিজেই দেখাচ্ছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট সংখ্যক মানুষের জন্য আপিলের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন একটাই। সেটা হল একজন যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়লে তাঁকে পুনরায় ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার সুযোগ কতটা সহজ, দ্রুত এবং স্বচ্ছভাবে দেওয়া হচ্ছে? আরও বড় প্রশ্ন হল, কমিশনের ভিতরেই যদি কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ থাকে, সেই মতভেদ কি প্রকাশ্য নথিতে যথেষ্ট স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে? নাগরিকরা কি জানতে পারবেন, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? কোন আইনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে? কে আপত্তি করেছিলেন? সেই আপত্তির কী নিষ্পত্তি হয়েছে?
গণতন্ত্রে মতভেদ অবশ্যই বিপজ্জনক নয়। বরং একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভিতরে মতভেদ থাকা এবং তা নথিবদ্ধ হওয়া অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের সুস্থতার লক্ষণও হতে পারে। কিন্তু বিপদ শুরু হয় তখন, যখন মতভেদের নিষ্পত্তির পদ্ধতি অস্বচ্ছ হয়ে যায়। তাই এই মুহূর্তে ভারতীয় গণতন্ত্রের সামনে অসংখ্য প্রশ্ন এসে জমা হয়েছে।
বিরোধীরা ইতিমধ্যেই কমিশনের বিরুদ্ধে নানা দাবি তুলেছেন। সেগুলির মধ্যে কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য, কিছু গুরুতর অভিযোগ। সেগুলির প্রতিটিকে একই মাত্রার সত্য বলে ধরে নেওয়াও যেমন ঠিক নয়, তেমনই রাজনৈতিক অভিযোগ বলে সব প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়াও গণতন্ত্রের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়। ভারতীয় গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই। কোনও প্রতিষ্ঠান প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়, আবার কোনও প্রতিষ্ঠানকে প্রমাণ ছাড়াই অভিযুক্ত করাও গণতন্ত্রের পক্ষে সমান বিপজ্জনক। তাই এখন প্রয়োজন নথি প্রকাশ। কমিশনের ভিতরে আসলে কী ঘটেছে, তা মানুষ জানতে চায়। আইনের সামনে জবাবদিহি করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। কারণ নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠা মানে গণতন্ত্রের বিপন্নতা। যে কোনও মূল্যে তাকে রক্ষা করতে হবে।
একজন ভোটারের ব্যালটে আস্থা অটুট রাখাটাই নির্বাচন কমিশনের কাজ। সেই আস্থা কোনওভাবে একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু একটি নির্বাচন নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি নাগরিকের বিশ্বাসই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এখন সেই বিশ্বাসকে অটুট রাখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনেরই। কেননা তারাই তো গণতন্ত্রের অভিভাবক।
