ডানহাতি না বাঁহাতি? জীবনের প্রাচীন রহস্যের সমাধান, রসায়নে নোবেল দুই বিজ্ঞানীর
স্টকহোম: জীবন অপ্রতিসম কেন? প্রকৃতির কোন প্রতিবিম্ব রূপ এই জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে? খুব কঠিন শোনাচ্ছে কি? এবার এই সব রহস্যের সমাধান রসায়নের মাধ্যমে করেই নোবেল পুরস্কার পেলেন ফ্রান্সের অঁরি বি. কাগান এবং জাপানের কেনসো সোয়াই। প্রকৃতি কীভাবে কোনও অণুর আয়নায় দেখা প্রতিবিম্ব বাদ দিয়ে শুধু সঠিক রূপটিই তৈরি করে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দিয়েছেন এই দুই বিজ্ঞানী।
অণুর প্রতিবিম্ব রূপের গঠন
প্রোটিনের গঠনের মূল উপাদান অ্যামাইনো অ্যাসিডের মতো অণুর দু’টি রূপ থাকে, যারা পরস্পরের আয়নায় দেখা প্রতিবিম্ব। অথচ পৃথিবীর জীবজগৎ কাজ করে কেবল একটি রূপ নিয়েই। জৈব রসায়নে এই বৈশিষ্ট্যের নাম “কাইরালিটি” (chirality)। কাইরাল অণুর ডানহাতি ও বাঁহাতি দু’টি রূপই থাকে। আমাদের দুই হাতের কথা ভাবলেই বোঝা যায়: দেখতে এক নয়, আবার একটি অন্যটির প্রতিবিম্বও বটে। প্রকৃতি প্রায় সবসময় নিজের প্রয়োজনের রূপটিই তৈরি করে। কিন্তু পরীক্ষাগারে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সাধারণত বাঁহাতি ও ডানহাতি অণু ৫০-৫০ অনুপাতে তৈরি হয়। ওষুধ বানানোর সময় এই পার্থক্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শরীরের ভেতরে দু’টি রূপের আচরণ আলাদা। একটি রোগ সারাতে পারে, অন্যটি কোনও কাজই করে না, এমনকি ক্ষতিও করতে পারে।
কাইরালিটির রহস্য ভেদ করে কাগান ও সোয়াই দেখিয়েছেন, কীভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়া এমনভাবে সাজানো যায়, যাতে কাঙ্ক্ষিত রূপটি অনেক বেশি পরিমাণে তৈরি হয়। নোবেল কমিটির রসায়ন শাখার চেয়ার হাইনার লিঙ্কে বলেন, “হোমোকাইরালিটি, অর্থাৎ অণুর সঠিক রূপটির বেছে নিয়ে তৈরি হওয়া, কীভাবে নিজে থেকেই উদ্ভূত হতে পারে, সেই শতাধিক বছরের পুরনো রাসায়নিক রহস্যের সমাধান দিয়েছেন কাগান ও সোয়াই। তাঁদের তৈরি রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলি দুর্দান্ত।”
কাগানের অবদান: বর্তমানে ইউনিভার্সিটি প্যারিস-সুদ-এর সঙ্গে যুক্ত কাগান ১৯৮৬ সালে রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন পথ আবিষ্কার করেন। এর ফলে একটি প্রতিবিম্বরূপ আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে তৈরি করা সম্ভব হয়।
সোয়াইয়ের অবদান: টোকিয়ো ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্সের সোয়াই ১৯৯৫ সালে পরের ধাপটি পেরিয়ে যান। নেচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে তিনি এমন প্রথম রাসায়নিক বিক্রিয়ার বর্ণনা দেন, যা হোমোকাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, অর্থাৎ শুধু কাঙ্ক্ষিত রূপের জৈব অণু তৈরি করতে পারে। ২০০৩ সালে তিনি এমন একটি বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সফল হন, যেখানে দুই প্রতিবিম্বের মধ্যে কেবল একটিই তৈরি হয়েছে। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, “আর কেউ এর আগে এই কীর্তি করে দেখাতে পারেনি।”
ফোনে নোবেল সাংবাদিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে সোয়াই বলেন, “আমার জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিনগুলির একটি এটি।” পরে তিনি এই ক্ষেত্রে কাজ করা “বহু বহু চমৎকার গবেষকের” প্রশংসাও করেন।গ্রেট ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটি অফ কেমিস্ট্রির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক রবার্ট মোকায়া বলেন, মৌলিক রসায়ন যে সমাজের বড় বড় সমস্যার সমাধানের ভিত্তি হতে পারে, এই কাজ তার শক্তিশালী উদাহরণ। তাঁর কথায়, “একই অণুর বিভিন্ন আইসোমারের জৈব ও ভৌত প্রভাব সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে, তাই নানা রোগের কার্যকর ওষুধ খুঁজতে এগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
জীবনের উৎস বোঝার সূত্র
নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাঙ্গাস ডেভিসন কাইরালিটির জীববিদ্যা নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর মতে, এই রসায়ন থেকে জানা যেতে পারে জীবন কেন ও কীভাবে “এক-হাতি” রূপ বেছে নেয়। তিনি বিবিসিকে বলেন, “আমরা এখনও পুরোপুরি বুঝি না, কিন্তু জীবনের মূল উপাদানগুলির কাইরালিটি শেষ পর্যন্ত এমন দেহ গড়ে তোলে, যা নিজেরাও কাইরাল।” এ কারণেই আমাদের হৃদয় শরীরের বাঁ দিকে থাকে, আর শামুকের খোল ডান দিকে পাক খায়।
নোবেল কমিটির সদস্য পিটার সমফাই বলেন, এ বছরের পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষণা এখন “রসায়ন কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে আমাদের মৌলিক ধারণার” অংশ। তাঁর মতে, প্রতিবিম্বরূপ কীভাবে তৈরি হয় তা দেখানো “সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন”, কারণ চার বিলিয়ন বছর আগে জীবন সৃষ্টির সময় কোনওভাবে সেটাই ঘটেছিল। তিনি যোগ করেন, “এবার আমরা প্রথমবার পরীক্ষাগারে তার অনুকরণ করতে পেরেছি।”
