হ্যান্ড অফ গডের সেই বল বিক্রি হলো মাত্র ২৫ লাখ পাউন্ডে !
লন্ডন : ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের বল এবার নিলামে উঠেছে।
দিয়েগো মারাদোনারপ ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল যে বল দিয়ে হয়েছিল, সেই বলই এখন নতুন মালিকের হাতে। হেরিটেজ অকশনে এই বল বিক্রি হয়েছে ৩৩ লাখ ডলার বা প্রায় ২৫ লাখ পাউন্ডে। যদিও আগে ধারণা করা হয়েছিল, বলটি ১ কোটি ডলার বা প্রায় ৭৩ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত উঠতে পারে।
বাস্তবে দাম সেই প্রত্যাশার অনেক নিচেই থেকে গেল।মারাদোনার সেদিন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে দুই গোল করেছিলেন। প্রথম গোলটি ছিল হাত দিয়ে। পিটার শিলটনকে এড়িয়ে তিনি হাত দিয়ে বল ঠেলে দিয়েছিলেন। পরে সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেছিলেন, “একটু আমার মাথায়, আর একটু ঈশ্বরের হাতে।” সেই গোলই ইতিহাসে ‘হ্যান্ড অফ গড’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
একই ম্যাচে তিনি আরও একটি গোল করেছিলেন, যা এখন ‘গোল অফ দ্য সেঞ্চুরি’ নামে পরিচিত। তিনি একাই পাঁচজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে এড়িয়ে গিয়ে শিলটনকে ফাঁকি দিয়ে গোল করেন। আর্জেন্টিনা সেদিন ২-১ গোলে জিতেছিল। সেই ম্যাচের রেফারি ছিলেন তিউনিশিয়ার আলি বিন নাসের। ম্যাচ শেষে তিনি অ্যাডিডাস আজটেকা বলটি নিয়ে যান এবং তিন দশকেরও বেশি সময় নিজের কাছে রেখেছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি চিঠি দিয়ে নিশ্চিত করেন যে, পুরো ম্যাচে শুধুমাত্র এই একটি বলই ব্যবহার করা হয়েছিল। স্বাধীন যাচাইয়েও এই তথ্য সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বিন নাসের ২০২২ সালে এই বল ২৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার বা প্রায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ডে বিক্রি করেছিলেন। নতুন মালিক আবার ২০২৩ সালে নিলামে তুলেছিলেন, কিন্তু ন্যূনতম দাম না ওঠায় বিক্রি হয়নি। এবার অবশেষে ৩৩ লাখ ডলারে বিক্রি হলো। হেরিটেজ অকশনের বিশেষজ্ঞ নিলামকারী মাইক প্রোভেঞ্জালে নিলামের আগে রয়টার্সকে বলেছিলেন, “এটি সত্যিই একক আইটেম। ফুটবলের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস।”
একই ম্যাচে মারাদোনা যে জার্সি পরে খেলেছিলেন, সেটি ২০২২ সালে নিলামে ৭১ লাখ পাউন্ডে বিক্রি হয়েছিল। জার্সির দামের তুলনায় বলের দাম অনেক কম হলেও, ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই বল এখনও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকো সিটির আজটেকা স্টেডিয়ামে সেই ম্যাচটি হয়েছিল। ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা তখন শুধু ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর দুই দেশের সম্পর্ক ছিল উত্তপ্ত। সেই পটভূমিতে মারাদোনার হাতের গোল আরও বেশি আলোড়ন তুলেছিল।ইংলিশরা গোলটি বাতিল করার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু রেফারি বিন নাসের গোলটি দিয়ে দিয়েছিলেন।
পরে মারাদোনা নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি হাত ব্যবহার করেছিলেন। তবুও সেই গোল আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তারা বিশ্বকাপ জিতে নেয়। বলটি এখন নতুন মালিকের কাছে। কে কিনেছেন, তা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে ফুটবলের ইতিহাসে এই বল চিরকাল ‘হ্যান্ড অফ গড’র প্রতীক হিসেবেই থাকবে।
দিয়েগো মারাদোনা ২০২০ সালে মারা যান। কিন্তু তাঁর সেই দুই গোল—একটি হাতের, আরেকটি পায়ের—ফুটবলের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। আর সেই গোলের সাক্ষী বল এখন নিলামের মাধ্যমে নতুন হাতে চলে গেল। ফুটবলপ্রেমীরা বলছেন, দাম যাই হোক, এই বলের আসল মূল্য টাকায় মাপা যায় না। এটি শুধু একটি চামড়ার বল নয়, এটি একটি যুগের প্রতীক।
মারাদোনার জাদু, বিতর্ক, উত্তেজনা—সবকিছু মিশে আছে এই বলের মধ্যে। হেরিটেজ অকশনের এই নিলাম ফুটবল সংগ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছিল। অনেকেই আশা করেছিলেন, বলটি রেকর্ড দামে বিক্রি হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৩৩ লাখ ডলারেই থেমে গেল। তবুও এটি ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি বলগুলোর মধ্যে একটি হিসেবেই থাকবে।
মারাদোনার সেই হাতের গোল আজও বিতর্কের বিষয়। কেউ বলেন, এটি প্রতারণা। কেউ বলেন, এটি প্রতিভা। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত—সেই গোল ফুটবলের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। আর সেই গোলের বল এখন নতুন মালিকের সংগ্রহে। আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীরা এই সংবাদে উচ্ছ্বসিত। তারা বলছেন, মারাদোনার স্মৃতি আজও জীবন্ত।
ইংলিশরা হয়তো এখনও সেই গোলের কথা ভুলে যাননি। কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে এটি চিরকাল ‘হ্যান্ড অফ গড’ হিসেবেই থাকবে।বলটির নতুন মালিক যদি কখনো এটি প্রদর্শনীতে রাখেন, তাহলে ফুটবলপ্রেমীরা নিশ্চয়ই দেখতে ভিড় জমাবেন। কারণ এটি শুধু একটি বল নয়—এটি ম্যারাডোনার জাদুর এক টুকরো।
