বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
সিটি সেন্টার ২-এর পিছনের ঝুপড়িতে আগুন অমিতাভ বচ্চনের বাসভবনের বোমাতঙ্কের হুমকি পাক জঙ্গিদের টার্গেটে বাংলার মুখ্য়মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মন্দারমণির সমুদ্রে তলিয়ে গেল মামা-ভাগ্নে

আন্তর্জাতিক শিল্পী দিবসে শিল্পীহারা বাংলা! প্রয়াত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী, শিল্পজগতে একটি অধ্যায়ের অবসান

25 October, 2026 11:55 AM UTSAB RC
শেয়ার করুন

কী অদ্ভূত সমাপতন! আজ ২৫ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক শিল্পী দিবস। আর আজই রং, তুলির জগত থেকে চিরবিদায় নিলেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। বাংলার শিল্পজগতে এক বর্ণময় অধ্যায়ের অবসান হল। ৮৭ বছর বয়স হয়েছিল তাঁর। রবিবার সকালে কলকাতার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। রক্তের ক্যানসার এবং মূত্রনালির সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় শিল্পজগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ১৪ মাস ধরে রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন যোগেন চৌধুরী। চলছিল কেমোথেরাপি। দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সংক্রমণের কারণে তাঁর শরীরে সেপসিসের উপসর্গ দেখা দেয়। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠলে শনিবার তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। চিকিৎসকদের সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানেন শিল্পী। ১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের দাহারপাড়া গ্রামে জন্ম যোগেন চৌধুরীর। তাঁর বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন জমিদার। ছোটবেলায় মায়ের আলপনা আঁকার মধ্যেই শিল্পের প্রতি তাঁর আকর্ষণের সূত্রপাত। দেশভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন তিনি। এই শহরেই শুরু হয় তাঁর শিল্পশিক্ষার আনুষ্ঠানিক পথচলা।

কর্মজীবনের শুরুতে হাওড়া জেলা স্কুলে অঙ্কন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন যোগেন। ১৯৬২ সালে কলকাতার হ্যান্ডলুম বোর্ডে ডিজাইনার হিসেবে যোগ দেন। শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে পরবর্তী সময়ে নিয়ে যায় প্যারিসে। ১৯৬৫ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য সেখানে পাড়ি জমান তিনি। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারির কিউরেটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। যোগেন চৌধুরীর শিল্পকর্মের বিশেষত্ব ছিল সমাজ ও রাজনীতিকে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর ছবিতে উঠে এসেছে সমকালীন জীবনের অসংগতি, ক্ষমতার চরিত্র এবং মানুষের নানা মানসিক ও সামাজিক টানাপোড়েন। ভারতীয় শিল্পধারা ও ইউরোপীয় শিল্প আন্দোলনের প্রভাবকে নিজের স্বতন্ত্র শৈলীতে মিশিয়ে তৈরি করেছিলেন এক অনন্য শিল্পভাষা। সেই কারণেই তাঁর কাজ শুধু নান্দনিকতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছিল সময়কে পড়ারও এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

শিল্পের পরিসরকে গ্যালারির চার দেওয়ালে আটকে রাখেননি যোগেন। কলকাতার দুর্গাপুজোর শিল্পভাবনাতেও রেখেছিলেন নিজের সৃজনশীলতার ছাপ। বিভিন্ন সময়ে একাধিক পুজোর থিম ও নকশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০১৭ সালে বেহালা নূতন দলের দুর্গাপুজোর প্রতিমার স্কেচ তৈরি করেছিলেন। পরের বছর ঠাকুরপুকুর স্টেট ব্যাঙ্ক পার্ক সর্বজনীনের প্রতিমার চালচিত্র নির্মাণের ভাবনাতেও ছিল তাঁর শিল্পীসত্তার স্পর্শ। শিল্পের পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিল তাঁর জীবন। রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তবে তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি ছিল ক্যানভাসে গড়ে তোলা নিজস্ব জগৎ—যেখানে শিল্প কেবল সৌন্দর্য সৃষ্টির মাধ্যম নয়, সমাজ ও সময়কে প্রশ্ন করার ভাষাও।

একজন শিল্পীর মৃত্যু মানে শুধু একটি জীবনের অবসান নয়, তাঁর দেখা পৃথিবীকে প্রকাশ করার এক স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গিরও বিদায়। যোগেন চৌধুরী রেখে গেলেন এমনই এক শিল্পভুবন, যেখানে রেখা, রং ও অবয়বের মধ্য দিয়ে ধরা পড়েছে সমাজের অন্তর্লীন বাস্তবতা। তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়েই আগামী প্রজন্মের কাছে বেঁচে থাকবে তাঁর শিল্পীসত্তা।

প্রতিবেদন

UTSAB RC