বক্তব্য জানাতে হবে ২০ সাংসদকেই, দলবদল নিয়ে অভিষেকের করা মামলায় সুদীপ-কাকলিদের নোটিস
নয়াদিল্লি : তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে ‘ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI)-তে যোগ দিয়ে এনডিএ-র হাত ধরা ২০ জন বিদ্রোহী লোকসভা সাংসদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপে সাফল্য পেল জোড়াফুল শিবির। মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ আদালত (সুপ্রিম কোর্ট) ওই ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের জবাব তলব করে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা লোকসভার দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা এক আবেদনের ভিত্তিতে এই নোটিস জারি করেছে শীর্ষ আদালত। তৃণমূলের মূল দাবি ছিল— লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা যাতে এই ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের বিরুদ্ধে আনা খারিজ বা দলবদল বিরোধী আবেদনের (Disqualification Petition) ওপর দ্রুত এবং সময়সীমাবদ্ধ সিদ্ধান্ত নেন।
আদালতের তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি বিপুল এম পঞ্চোলির সমন্বয়ে গঠিত তিন বিচারপতির বেঞ্চে মঙ্গলবার এই হাই-প্রোফাইল মামলার শুনানি হয়।
শুনানির শুরুতে আদালত লোকসভার স্পিকারকেও নোটিস জারির ইঙ্গিত দিয়েছিল। তবে স্পিকারের পক্ষে উপস্থিত সলিসিটর জেনারেল (SG) তুষার মেহতা অনুরোধ করেন যেন স্পিকারকে আলাদা করে নোটিস না দেওয়া হয়, কারণ তিনি নিজেই স্পিকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তুষার মেহতা আদালতকে জানান, স্পিকার ইতিমধ্যেই দলবদল বিরোধী আবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক নোটিস জারি করার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
সলিসিটর জেনারেলের এই সওয়ালের জবাবে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি কড়া ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, “বিষয়টি স্রেফ নোটিস জারির নয়; আসল প্রশ্ন হলো নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পুরো প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত বা শেষ করা হচ্ছে কি না।”
তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া ও আইনি অবস্থান
আদালতের এই অবস্থানের পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে সওয়াল করা প্রবীণ আইনজীবী তথা তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই নির্দেশকে দলের বড় জয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, আদালত খুব শীঘ্রই এই বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশ ও শুনানির দিন নির্ধারণ করবে।
প্রসঙ্গত, লোকসভার ২০ জন তৃণমূল সাংসদ হঠাৎ করেই দলবিরোধী অবস্থান নিয়ে দাবি করেন যে তাঁরা ত্রিপুরা-ভিত্তিক ‘ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI)-র সঙ্গে যুক্ত বা বিলীন হয়েছেন এবং সংসদে তাঁদের আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদন জানান। পরবর্তীতে সংসদে তাঁদের এনসিপিআই (NCPI) গোষ্ঠী হিসেবে ধরে নেওয়া হয় এবং তাঁরা শাসকজোট NDA-র একাধিক বৈঠকে অংশ নেন।
তৃণমূল কংগ্রেস শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে, এই সাংসদরা তৃণমূলের প্রতীক ও টিকিটে জিতে লোকসভায় এসেছিলেন। অন্য কোনো রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করা মানেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে মূল দলের সদস্যপদ ত্যাগ করা। সংবিধানের দশম তফসিল বা দলবদল বিরোধী আইনের (Anti-Defection Law) আওতায় তাঁদের সাংসদ পদ অবিলম্বে খারিজ হওয়া উচিত। অন্যদিকে, বিদ্রোহী শিবির এটিকে একটি বৈধ ও নিয়মমাফিক ‘সংযোজন’ বা বিলীন (Merger) বলে দাবি করে আসছিল।
যে ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদকে নোটিস পাঠানো হয়েছে:
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেদনে লোকসভার স্পিকার ও লোকসভার সচিবালয় ছাড়াও যে ২০ জন সাংসদকে বিবাদী হিসেবে নাম দেওয়া হয়েছে, তাঁরা হলেন:
-
কাকলি ঘোষ দস্তিদার
-
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
-
শতাব্দী রায়
-
প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়
-
রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়
-
জগদীশ চন্দ্র বর্মা বাসুনিয়া
-
পার্থ ভৌমিক
-
অরূপ চক্রবর্তী
-
অধিকারী দীপক দেব (দেব)
-
সায়নী ঘোষ
-
বাপি হালদার
-
মো: আবু তাহের খান
-
কালীপদ সোরেন খেরওয়াল
-
অসিত কুমার মাল
-
জুন মালিয়া
-
মিতালী বাগ
-
খলিলুর রহমান
-
মালা রায়
-
শর্মিলা সরকার
-
ইউসুফ পাঠান
স্পিকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার বিরুদ্ধে অভিষেকের এই আইনি পদক্ষেপ দেশের রাজনীতি এবং সংসদীয় প্রক্রিয়ায় নতুন মোড় এনে দিল। সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করায় এখন স্পিকারকে দ্রুত সিদ্ধান্তের দিকে হাঁটতে হবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ও আইনি বিশেষজ্ঞ মহল।
