আকাশপ্রদীপ: পিতৃপুরুষের উদ্দেশে শ্রদ্ধার এক আলোক নিবেদন

চিরঞ্জিত সরকার
কার্তিক মাস এলেই বাংলার বহু বাড়ির উঠোনে, তুলসীমঞ্চের পাশে কিংবা বাড়ির উঁচু প্রান্তে দেখা যায় একটি প্রদীপের আলো। কোথাও বাঁশের লম্বা খুঁটির মাথায়, কোথাও আবার উঁচুতে ঝুলিয়ে রাখা ছোট্ট মাটির প্রদীপ। সন্ধ্যার অন্ধকারে সেই আলো যেন মাটি থেকে আকাশের দিকে উঠে যাওয়া এক নীরব প্রার্থনা। এই প্রদীপই আকাশপ্রদীপ। কিন্তু কেন এই রীতি? এর পিছনে রয়েছে পুরাণের আখ্যান, ধর্মীয় বিশ্বাস, পিতৃপুরুষের স্মৃতি এবং বাংলার প্রাচীন লোকাচারের এক দীর্ঘ ইতিহাস।
পুরাণে আকাশপ্রদীপের মাহাত্ম্য
আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর উল্লেখ রয়েছে স্কন্দপুরাণের কার্তিক মাসের মাহাত্ম্যবিষয়ক অধ্যায়ে। সেখানে ব্রহ্মা নারদকে আকাশপ্রদীপের মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করেছেন। কার্তিক মাসে উঁচু স্থানে প্রদীপ জ্বালিয়ে ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশে তা নিবেদন করার কথা বলা হয়েছে।
পুরাণের এই বর্ণনায় প্রদীপ কেবল আলো জ্বালানোর উপকরণ নয়, এটি ভক্তি ও পুণ্য অর্জনের প্রতীক। বিশ্বাস করা হয়, কার্তিক মাসে নিয়মিত প্রদীপ দান করলে মানুষের জীবনে মঙ্গল আসে এবং পরমেশ্বরের কৃপা লাভ হয়। পদ্মপুরাণেও কার্তিক মাসে আকাশের দিকে প্রদীপ নিবেদনের বিশেষ মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে।
হিন্দু ধর্মবিশ্বাস অনুসারে, বর্ষাকালের চার মাস যোগনিদ্রায় থাকার পর ভগবান বিষ্ণু কার্তিক মাসে জেগে ওঠেন। এই সময়টি তাই বৈষ্ণবদের কাছে বিশেষ পবিত্র। প্রদীপ জ্বালিয়ে বিষ্ণুর আরাধনা করার মধ্যে দিয়ে ভক্তরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তবে যোগনিদ্রা থেকে বিষ্ণুর জাগরণের নির্দিষ্ট তিথি হিসেবে কার্তিক শুক্ল একাদশী বা প্রবোধিনী একাদশী বিশেষভাবে পরিচিত।
পিতৃপুরুষের উদ্দেশে আলোর নিবেদন
আকাশপ্রদীপের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পিতৃপুরুষের স্মৃতিও। বাংলার লোকবিশ্বাসে, উঁচুতে প্রদীপ জ্বালানো হয় পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে আলো নিবেদন করার জন্য। কোথাও এই আলোকে পিতৃলোকের উদ্দেশে প্রার্থনা, আবার কোথাও তাঁদের পথ দেখানোর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
স্কন্দপুরাণের আকাশপ্রদীপ-সংক্রান্ত বর্ণনাতেও পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে প্রদীপ নিবেদনের উল্লেখ রয়েছে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, পূর্বপুরুষদের পথ দেখানোর এই ধারণা মূলত লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার অংশ। সব অঞ্চলে এই প্রথার অর্থ এক নয়। কোথাও বিষ্ণুর উদ্দেশে, কোথাও পিতৃপুরুষের স্মরণে, আবার কোথাও পরিবারের মঙ্গলকামনায় আকাশপ্রদীপ জ্বালানো হয়।
এই প্রথার মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের চিহ্ন। বর্ষা পেরিয়ে আকাশ যখন পরিষ্কার হতে শুরু করে, সন্ধ্যা নামে দ্রুত, তখন অন্ধকারের মধ্যে উঁচুতে জ্বলে থাকা প্রদীপ যেন মানুষের ঘর থেকে আকাশের দিকে পাঠানো এক আলোর বার্তা।
গ্রামীণ জীবনে আলো শুধু দৈনন্দিন প্রয়োজন নয়, শুভ ও অশুভের প্রতীকও। অন্ধকারকে অজ্ঞানতা, অনিশ্চয়তা কিংবা বিপদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বহু ধর্মীয় আখ্যান ও লোককথায়। সেই অন্ধকারের মধ্যে একটি প্রদীপ জ্বালানো মানে শুভের আহ্বান, মঙ্গলের প্রার্থনা এবং জীবনের প্রতি আস্থা প্রকাশ করা।
প্রদীপের ছোট্ট শিখাটি হয়তো আকাশ পর্যন্ত পৌঁছয় না, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস তাকে আকাশের সঙ্গে যুক্ত করে। সেই বিশ্বাসেই কার্তিকের সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বলে ওঠে। কোনও বাড়িতে নিয়ম মেনে, কোনও বাড়িতে বংশপরম্পরায় চলে আসা অভ্যাসে, আবার কোথাও হারিয়ে যেতে বসা এক পুরনো লোকাচারকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে।
আকাশপ্রদীপ তাই শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়। এটি স্মৃতি, ভক্তি ও আশার সম্মিলিত প্রতীক। মাটির প্রদীপে তেল ফুরিয়ে যায়, শিখা একসময় নিভে আসে; কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতির মধ্যে যে আলো জ্বলে থাকে, তা বাংলার লোকসংস্কৃতিরই এক মূল্যবান উত্তরাধিকার।
