বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

এ আমার এ তোমার পাপ

20 August, 2026 2:43 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

সন্দীপন বিশ্বাস : আবার একটি অগ্নিকাণ্ড, আবার বেশ কিছু সাধারণ মানুষের মৃত্যু। আবার দায় ঠেলার প্রতিযোগিতা। আগের প্রতিবেদনটি তারাপীঠ অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু এবং গাফিলতি নিয়ে লিখেছিলাম। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আবার সেই আগুনে মৃত্যু নিয়েই লিখতে হচ্ছে। বারবার লিখতে হবে। এ যন্ত্রণা সহজে যাওয়ার নয়। কবিগুরুর ভাষায়, ‘এ আমার এ তোমার পাপ’। আমাদের ক্রমেই মানবিকতা থেকে সরে যাওয়ার পাপ। প্রশাসনের স্বার্থবুদ্ধির পাপ, আর সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়া আকণ্ঠ দুর্নীতির পাপ। অআমাদের মানসিক আপোসকামিতার পাপ। তারাপীঠের অগ্নিকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই কলকাতার নিউমার্কেট চত্বরে একটি হোটেলে আগুন লেগে প্রাণ গেল ন’জনের। একের পর এক আগুন, একের পর এক মৃত্যু। অথচ প্রতিবারই সেই একই চিত্রনাট্য। তদন্ত কমিটি গঠন, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা, কিছুদিনের হইচই, তারপর বিস্মৃতি। এই দু’টি ঘটনার মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও কারণ একটাই। বেআইনি নির্মাণ, ফায়ার সেফটি ছাড়পত্রের ফাঁকিবাজি এবং প্রশাসনিক নজরদারির অনুপস্থিতি। দীর্ঘদিন ধরেই তা চলছে। ভুক্তভোগী মানুষের বক্তব্য, পুরসভায় গেলেই হাত পাতছেন কর্মীরা। টাকা দিলে কাজ হবে, নাহলে হবে না। সুতরাং যাঁদের টাকা আছে, তাঁরা টাকা ফেলে নানা অসাধু কাজ পুরসভাকে দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে। দুর্ঘটনা, বিপর্যয়, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে বিষয়গুলি কয়েকদিনের জন্য সামনে আসে, আবার হারিয়ে যায়। তাই আগের মতো এবারেও প্রশ্ন উঠছে, আর কতদিন প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে মানুষ এভাবে পুড়ে মরবে? কতগুলি চিতা জ্বললে টনক নড়বে সিস্টেমের?

এই দুর্ঘটনাগুলি বিচ্ছিন্ন নয়, দুর্ঘটনাও নয় প্রকৃত অর্থে। এগুলি একটি পচে যাওয়া সিস্টেমের অনিবার্য পরিণতি। বছরের পর বছর ধরে এই ব্যবস্থায় লাইসেন্স মেলে ঘুষের বিনিময়ে, অগ্নি-নিরাপত্তা শংসাপত্র হয়ে ওঠে কাগুজে আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। পুরসভা থেকে দমকল দপ্তর পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সেখানে তদারকির বদলে চলে তোলাবাজি ও রাজনৈতিক আনুগত্যের হিসেব-নিকেশ। সুতরাং সেই ব্যবস্থারই স্বাভাবিক ফসল এই মৃত্যুমিছিল। পশ্চিমবঙ্গে বিগত সরকারের শাসনকালে যে দুর্নীতির শিকড় প্রোথিত হয়েছিল প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, আজ তারই ফল একে একে প্রকাশ্যে আসছে। যে বিষবৃক্ষ রোপিত হয়েছিল ক্ষমতার আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে, তার তিক্ত ফল আজ চোকাতে হচ্ছে নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে। কখনো সেতু ভেঙে, কখনো বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে, কখনো হাসপাতালের ভুয়ো চিকিৎসায়, কখনও জীর্ণ বাড়ি ভেঙে পড়ে। আর এখন তার প্রকাশ একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে। এ কোনও আকস্মিক দুর্ভাগ্য নয়, এ দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতির সুদে-আসলে ফেরত আসা মূল্য।

কিন্তু এখানেই থেমে গেলে চলবে না। শুধু অতীতের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার সুযোগ বর্তমান প্রশাসনের থাকা উচিতও নয়। আপাদমস্তক দুর্নীতিতে যুক্ত দলটিকে মানুষ ভোটবাক্সে মানুষ বিদায় দিয়েছে। নতুন সরকারের কাছে মানুষের নতুন প্রত্যাশা। এখন ক্ষমতায় থাকার অর্থই হল বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিটি ত্রুটি সংশোধনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া। অতীতের প্রতি আঙুল তোলা যত সহজ, বর্তমানের ব্যর্থতা স্বীকার করা ততটাই কঠিন, কিন্তু জরুরি। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত কমিটি গঠন আর ক্ষতিপূরণ ঘোষণার আনুষ্ঠানিকতা নিছক লোকদেখানো প্রতিক্রিয়া, প্রকৃত সমাধান নয়। এই সান্ত্বনা-রাজনীতি দিয়ে মৃত মানুষের পরিবারকে শান্ত করা যায়, কিন্তু পরবর্তী মৃত্যু ঠেকানো যায় না। প্রয়োজন নিয়মিত ও নিরপেক্ষ অগ্নি-নিরাপত্তা পরিদর্শন, লাইসেন্সহীন ও নিয়মভাঙা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আপসহীন পদক্ষেপ, দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, এবং সর্বোপরি প্রশাসনের সাধারণ মানুষের কাছাকাছি পৌঁছনো, যাতে বিপদ ঘটে যাওয়ার পর নয়, তার আগেই তা প্রতিরোধ করা যায়।

রাজনৈতিক তরজায় বিরোধী দলকে দোষারোপ করা সবচেয়ে সহজ ও সবচেয়ে সস্তা পথ। কিন্তু পোড়া মানুষের দেহের সামনে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক বাগ্‌যুদ্ধ নিতান্তই ঠুনকো। মানুষের প্রাণের দাম কোনও রাজনৈতিক বিবৃতির চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। অতীতের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে আরও সতর্ক হতে হবে। একই সঙ্গে পুরনো সরকারের কাজের তীব্র সমালোচনা করব এবং পাশাপাশি তাদের দলের নেতাদের ‘ভালো তৃণমূল’ আখ্যা দিয়ে গদগদভাবে জড়িয়ে ধরব, দুটো একসঙ্গে হয় না। খারাপকে মানুষ বর্জন করেছে। বর্তমান সরকারকেও তাদের সংসর্গ ত্যাগ করতে হবে। সেইসঙ্গে অপরাধীদের কঠিন শাস্তি দিয়ে বোঝাতে হবে, বর্তমান সরকার দুষ্টু লোককে ছাড়নেওয়ালা নয়। তবেই সরকারের প্রতি মানুষের ভয় ও শ্রদ্ধা জন্মাবে।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee