প্রিন্সিপালকে ২৭ বার কোপানোর পেছনে লুকিয়ে কোন ভয়ঙ্কর সত্য?
হায়দরাবাদ : টাকার লোভ আর অতিরিক্ত বিলাসী জীবনের চরম নেশা—এই দুইয়ের যোগফলে যে এক কিশোর মন এতটা নৃশংস রূপ নিতে পারে, তা হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি তেলেঙ্গানার নালগোন্ডা শহরের সাধারণ মানুষ। ৪-৫ দিন ধরে খাতা এঁকে ছক কষা, গ্লাভস আর বানর টুপি কিনে হামলা চালানো, আর তারপর ধরা পড়ার ভয়ে শিক্ষককেই পিটিয়ে ও ২৭ বার ছুরি দিয়ে কুপিয়ে খুন! তেলেঙ্গানার কোনডামাল্লেপল্লির ‘নাগার্জুন পাবলিক স্কুল’-এর ৪৮ বছর বয়সী প্রিন্সিপাল তথা ডিরেক্টর কাল্লু রূপা রেড্ডি হত্যাকাণ্ডের যে ভয়াবহ তথ্য সম্প্রতি সামনে এসেছে, তা পুরো দেশজুড়ে রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়ে দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ১২ আগস্ট সকালে। তেলেঙ্গানার কোনডামাল্লেপল্লি এলাকায় নিজের বাড়ি থেকেই উদ্ধার হয় রূপা রেড্ডির রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত দেহ। রূপা দেবীর স্বামী কাজের সূত্রে হায়দরাবাদে ছিলেন। সকাল থেকে স্ত্রীকে বারবার ফোন করেও না পেয়ে তিনি প্রতিবেশীদের খবর দেন। প্রতিবেশীরা এসে দরজা খুলে দেখেন, ঘরের মেঝেতে নিথর অবস্থায় পড়ে রয়েছে রূপা দেবীর দেহ। শরীরে অন্তত ২৭টি ছুরির আঘাত!
তদন্তে নেমে তেলেঙ্গানা পুলিশ ৫টি বিশেষ টিম গঠন করে। সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক টেস্ট, আঙুলের ছাপ এবং প্রায় ৮০ জন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও প্রথম দিকে স্পষ্ট কোনো সূত্র পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে মোড় ঘোরে রূপা দেবীর একটি কল রেকর্ড খতিয়ে দেখার পর। পুলিশ জানতে পারে, মৃত্যুর ঠিক কিছুক্ষণ আগে তিনি তাঁর এক পিসিমার সাথে ফোনে কথা বলছিলেন। সেই ফোনের একেবারে শেষ মুহূর্তে রূপা দেবী মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল একটি শব্দ— ‘বাবু’।
প্রবীণ পুলিশ অফিসার শরথ চন্দ্র পাওয়ার মিডিয়াকে জানান, স্থানীয় ভাষায় কাউকে স্নেহের সাথে ডাকতে ‘বাবু’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। পুলিশ তদন্তকারীদের মাথা চাড়া দেয়—রূপা দেবী কাকে নিজের ঘরে দেখে এমন পরিচিত ভঙ্গিতে ডাকতে পারেন? সেই সূত্র ধরে শুরু হয় স্কুলের ছাত্রদের ওপর নজরদারি।
স্কুলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘটনার পর থেকে দশম শ্রেণীর পাঁচটি ছেলে টানা অনুপস্থিত রয়েছে। তাদের মধ্যে আলাদা করে খোঁজ নিতেই পুলিশের চোখ কপালে ওঠে। দেখা যায়, দুজন ছাত্র হুট করে অঢেল টাকা ওড়াতে শুরু করেছে! নামীদামী পোশাক, বন্ধুদের নিয়ে রিসোর্টে পার্টি, নতুন আইফোন কেনা—হঠাৎ করেই তাদের জীবনযাত্রায় এক চরম বিলাসী পরিবর্তন এসেছে। এমনকি অপরাধ সংঘটিত করার পর তারা টাকা নিয়ে গোয়া ট্রিপেও ঘুরে এসেছে বলে খবর পায় পুলিশ।
বুধবার সকালে পুলিশ সেই দুই ছাত্রকে আটক করে জেরা শুরু করতেই বেরিয়ে আসে সমস্ত সত্য। ধরা পড়ে যায় তাদের সাজানো অপরাধের তাসের ঘর।
পুলিশি জেরায় প্রকাশ পায়, কিছুদিন আগেই স্কুলে হোস্টেলের ব্যাগ তল্লাশি করার সময় এই দুই ছাত্রের কাছ থেকে নগদ টাকা ও মোবাইল উদ্ধার করেছিলেন রূপা দেবী। নিয়ম ভাঙায় তিনি কড়া পদক্ষেপ নেন, তাদের অভিভাবকদের ডেকে পাঠান এবং ছেলেদের হোস্টেল থেকে বের করে ‘ডে-স্কলার’ করে দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর থেকেই প্রিন্সিপালের ওপর প্রচণ্ড ক্ষোভ জমেছিল তাদের মনে।
এর পাশাপাশি, সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন ভিডিও প্ল্যাটফর্মে ‘কীভাবে দ্রুত বড়লোক হওয়া যায়’—এমন সব ভিডিও দেখতে শুরু করেছিল তারা। সেই লোভে তারা প্রিন্সিপালের বাড়িতেই চুরির ছক কষে।
পরিকল্পনামাফিক তারা পাঁচ দিন ধরে রূপা দেবীর বাড়ির চারপাশ রেকি করে। পরিচয় লুকাতে বাজার থেকে গ্লাভস, একটি ধারালো ছুরি এবং বানর টুপি কেনে। ঘটনার দিন এক ছাত্র মুখে বানর টুপি ও হাতে গ্লাভস পরে নিঃশব্দে রূপা দেবীর শোবার ঘরে ঢোকে এবং সেখানে থাকা ২.৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
ঠিক তখনই ঘটে চরম বিপত্তি। ধস্তাধস্তির সময় দুর্ঘটনাবশত ছাত্রটির মুখের বানর টুপিটি খুলে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিন্সিপাল রূপা দেবী তৎক্ষণাৎ নিজের ছাত্রকে চিনে ফেলেন এবং বলে ওঠেন, “বাবু…!”
ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে আর কোনো দিক না ভেবে কাছে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে নিজের শিক্ষয়িত্রীকে একের পর এক কোপ মারতে শুরু করে ওই নাবালক। মোট ২৭ বার কোপানোর পর রক্তাক্ত অবস্থায় রূপা দেবী লুটিয়ে পড়েন।
খুনের পর রক্তমাখা পোশাক আর বানর টুপিটি নির্জন জায়গায় পুঁতে দিয়ে টাকা নিয়ে চম্পট দেয় তারা। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। তদন্তে নেমে পুলিশ তাদের কাছ থেকে ১.৫৪ লাখ টাকা (যার মধ্যে কিছু কারেন্সি নোটে তখনও রক্তের দাগ লেগে ছিল), একটি নতুন কেনা আইফোন এবং রূপা দেবীর চুরি যাওয়া মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন দুনিয়া আর রাতারাতি ধনী হওয়ার অসুস্থ বাসনা কীভাবে অল্পবয়সী শিক্ষার্থীদের ঠান্ডা মাথার খুনিতে পরিণত করছে, এই ঘটনা যেন আরও একবার সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
