বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
সিটি সেন্টার ২-এর পিছনের ঝুপড়িতে আগুন অমিতাভ বচ্চনের বাসভবনের বোমাতঙ্কের হুমকি পাক জঙ্গিদের টার্গেটে বাংলার মুখ্য়মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মন্দারমণির সমুদ্রে তলিয়ে গেল মামা-ভাগ্নে

পুজো শেষ: জাগ প্রদীপের শিখায় উৎসবের স্মৃতি, শূন্য মণ্ডপে বিষাদের সুর

22 October, 2026 4:43 PM Sandipan Saha
শেয়ার করুন

সংবাদদাতা: ভিড় নেই। ঢাকের বাদ্যি থেমেছে। আলোর রোশনাই মুছে গিয়ে মণ্ডপের আনাচকানাচে এখন শুধুই শূন্যতা। যে মণ্ডপ কয়েক দিন আগেও মানুষের কলরবে মুখর ছিল, যেখানে দেবী দর্শনের অপেক্ষায় উপচে পড়েছিল ভিড়, সেখানেই এখন জেগে রয়েছে জাগ প্রদীপের নিঃসঙ্গ শিখা। যেন সেই ছোট্ট শিখাটুকুর মধ্যেই বন্দি হয়ে আছে সদ্য ফুরিয়ে যাওয়া উৎসবের সমস্ত স্মৃতি। দেবী বিদায় নিয়েছেন। রয়ে গিয়েছে তাঁর আসার দিনগুলোর আলো, আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর একরাশ মনখারাপ।

বিজয়ার বিষাদ বাঙালির চিরকালীন। প্রতিবছরই তো এমন হয়। দেবী আসেন, চারপাশ আলোয় ভরে ওঠে, শহর থেকে মফস্‌সল—সর্বত্র শুরু হয় উৎসবের উদ্‌যাপন। নতুন পোশাক, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, রাত জেগে ঠাকুর দেখা, রেস্তোরাঁয় ভিড়, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাতায়াত—সব মিলিয়ে কয়েকটা দিন যেন সময়ের স্বাভাবিক নিয়মকেও পিছনে ফেলে এগিয়ে চলে। তারপর একদিন বিসর্জনের সুর বাজে। প্রতিমার চোখের দিকে তাকিয়ে বিদায় জানায় মানুষ। আর পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই মনে হয়, কী যেন নেই! যে শহর রাতভর জেগে ছিল, সেই শহরের বুকেই নেমে আসে অন্য এক নিস্তব্ধতা।

এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। উৎসবের ক্লান্তি চোখেমুখে নিয়ে মানুষ ফিরছে স্বাভাবিক জীবনে। পুজোর ছুটির অবসান। অফিসের দরজা খুলেছে, কাজে ফিরছেন কর্মীরা। টেবিলে জমে থাকা ফাইল, কম্পিউটারের পর্দায় একের পর এক ই-মেল, অসমাপ্ত কাজের তালিকা—সব আবার আগের মতো। যে মানুষটি কয়েক দিন আগেও শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন ঠাকুর দেখতে, তিনিই আজ সময়মতো অফিস পৌঁছনোর তাড়ায় ব্যস্ত। উৎসবের রেশ এখনও কাটেনি, অথচ জীবনের ঘড়ি কাউকে অতিরিক্ত সময় দিতে রাজি নয়।

হাসপাতালের ছবিটাও প্রায় একই রকম। পুজোর ছুটির পর হাসপাতালের আউটডোরে বাড়ছে রোগীর ভিড়। চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে অপেক্ষারত মানুষ, হাতে পুরনো প্রেসক্রিপশন, কারও সঙ্গে পরিবারের সদস্য। কেউ নিয়মিত পরীক্ষা করাতে এসেছেন, কেউ ছুটির দিনগুলো পার করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এসেছেন। অসুখবিসুখ তো উৎসবের ক্যালেন্ডার মেনে আসে না। আনন্দের দিনগুলোর পর জীবনের বাস্তবতাই আবার সামনে এসে দাঁড়ায়। হাসপাতালের করিডরে তাই অন্য এক ব্যস্ততা—এখানে উৎসবের আলো নয়, ভরসা খোঁজেন মানুষ।

অন্যদিকে, পুজোর সফর সেরে ঘরে ফিরছেন অনেকে। কেউ পাহাড় থেকে, কেউ সমুদ্রের কাছ থেকে, কেউ বা আত্মীয়ের বাড়িতে কাটানো কয়েকটা দিন শেষে। স্টেশন, বাস টার্মিনাস, বিমানবন্দর—ফেরার পথে ব্যস্ত যাত্রীরা। হাতে ব্যাগ, চোখেমুখে ভ্রমণের ক্লান্তি, সঙ্গে ঘুরে আসার নানা গল্প। কোথাও পাহাড়ের মেঘ, কোথাও সমুদ্রের ঢেউ, কোথাও অচেনা শহরের অলিগলি—সবই এখন স্মৃতির অ্যালবামে জমা পড়ছে। বাড়ি ফিরে আবার সংসার, সন্তানদের স্কুল, বাজারহাট, রান্নাবান্না আর কাজের চেনা রুটিন। ছুটির দিনগুলো যেন মুহূর্তের মধ্যেই ফুরিয়ে গেল।

তবু উৎসব কি সত্যিই শেষ হয়ে যায়? মণ্ডপের আলো নিভে যায়, কিন্তু তার রেশ থেকে যায় মানুষের কথায়, ছবিতে, স্মৃতিতে। মোবাইলের গ্যালারিতে জমে থাকে ঠাকুর দেখার অসংখ্য ছবি। সামাজিক মাধ্যমে ভেসে ওঠে পুজোর শেষ মুহূর্তের ভিডিও, বিসর্জনের শোভাযাত্রা, সিঁদুরখেলার দৃশ্য। বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা জানাতে জানাতে বন্ধুরা আবার পরের বছরের পরিকল্পনা শুরু করে দেয়। কেউ হিসেব মেলায় কতগুলো মণ্ডপ দেখা হল, কেউ ভাবে কোন পুজোয় যাওয়া হল না। আর কেউ নিঃশব্দে মনে মনে ফিরে যান সেই দিনগুলিতে, যখন প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে কাটানো কয়েকটা মুহূর্তই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

ফাঁকা মণ্ডপের সামনে দাঁড়ালে অবশ্য অন্য রকম অনুভূতি হয়। কয়েক দিন আগেও যেখানে পা ফেলার জায়গা ছিল না, সেখানে এখন পড়ে আছে উৎসবের শেষ চিহ্ন। কোথাও খোলা বাঁশের কাঠামো, কোথাও খুলে নেওয়া হচ্ছে আলোর সাজ, কোথাও জমে রয়েছে ফুলের শুকনো পাপড়ি। আর কোনও এক কোণে জ্বলছে একটি প্রদীপ। তার ক্ষুদ্র শিখায় যেন এখনও জেগে রয়েছে দেবীর উপস্থিতি। মনে হয়, মানুষ চলে গেলেও উৎসবের আত্মা এত সহজে চলে যেতে পারে না।

আসলে পুজো শুধু আনন্দের কয়েকটি দিন নয়। পুজো মানে অপেক্ষা, প্রস্তুতি, মিলন, বিচ্ছেদ। সারা বছর ধরে জমিয়ে রাখা ইচ্ছেগুলোকে কয়েক দিনের জন্য বাঁচিয়ে নেওয়া। উৎসব সবার জীবনে একই রকম নয়। ভিন্নতা থাকলেও উৎসবের শেষে শূন্যতার অনুভূতিটুকু যেন অনেকেরই চেনা।

দেবী বিদায় নিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে কি তবে চলে গেল সমস্ত আনন্দ? না, হয়তো আনন্দের প্রকাশটুকু বদলে গেল। জীবন আবার নিজের ছন্দে ফিরছে। এই ফিরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, এই ব্যস্ততাই জীবনের অনিবার্য নিয়ম।

তবু সন্ধ্যা নামলে হয়তো কেউ একবার ফাঁকা মণ্ডপের দিকে তাকাবেন। মনে পড়বে, কয়েক দিন আগেও এখানে কত মানুষ ছিল, কত হাসি, কত গল্প, কত প্রার্থনা। প্রদীপের শিখাটি তখনও হয়তো জ্বলবে—অথবা নিভে যাবে নিঃশব্দে। কিন্তু তার আলোয় যে স্মৃতিগুলো একবার জেগে উঠেছে, সেগুলো আর সহজে নিভবে না। তার মধ্যেই আবার অপেক্ষা, আবার দিন গোনা।

প্রতিবেদন

Sandipan Saha