৮ বছরের শিশুর পরনে ‘শর্টস’! সিংহগড় কেল্লায় পর্যটকদের উপর দু’ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব
পুণা: ৮ বছরের এক একরত্তি শিশু ছোট পোশাক অর্থাৎ ‘শর্টস’ পরেছিল— স্রেফ এই অপরাধেই এক পর্যটক পরিবারকে দুই ঘণ্টা ধরে হেনস্থা ও বেধড়ক মারধর করার অভিযোগ উঠল মহারাষ্ট্রের পুনেতে। বাদ যাননি নারী, শিশু এমনকি প্রবীণ নাগরিকরাও। স্বাধীনতা দিবসের ঠিক পরদিনই, অর্থাৎ ১৬ আগস্ট পুনের ঐতিহাসিক সিংহগড় কেল্লায় স্বঘোষিত ‘দুর্গ সংরক্ষণ গোষ্ঠী’র (Fort Conservation Society) কয়েকজন সদস্যের এই নীতি পুলিশগিরি ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ঘটনার খবর পেয়ে হেভেলি থানার পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে ঘটনার সাথে জড়িত ৯ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে।
পোশাক বিতর্ক থেকে নারকীয় অত্যাচার
মারাঠা সাম্রাজ্যের পরাক্রম এবং ছত্রপতি শিবাজী স্মৃতি বিজড়িত পুনের প্রাচীন দুর্গগুলি বরাবরই পর্যটকদের কাছে প্রিয় এক গন্তব্য। স্বাধীনতা দিবসের সপ্তাহের ছুটিকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার পর্যটক ভিড় জমিয়েছিলেন সিংহগড় কেল্লায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তেমনই এক সাধারণ পর্যটক পরিবারের সঙ্গে থাকা ৮ বছরের একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তানের পোশাক দেখে হঠাৎই চড়াও হয় নিজেদের ‘দুর্গ সংরক্ষণকারী’ দাবি করা একটি স্বঘোষিত দল। ‘ঐতিহাসিক স্থানে এ ধরনের পোশাক অনুপযুক্ত ও অশালীন’— এই অভিযোগ তুলে তর্ক জুড়ে দেয় অভিযুক্তরা।
অভিযোগ, পর্যটক পরিবারটি প্রতিবাদ করলে মুহূর্তের মধ্যে সেই বচসা মারাত্মক রূপ নেয়। সামান্য পোশাকের বাহানায় ওই পরিবারের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে দুষ্কৃতীরা। চোখের নিমেষে শুরু হয় এলোপাথাড়ি মারধর। আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকেন নারী ও শিশুরা, কিন্তু উন্মত্ত স্বঘোষিত ওই নীতি পুলিশদের মন গলানো যায়নি। রেহাই পাননি বৃদ্ধ ও মহিলারাও। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে সিংহগড় কেল্লার চত্বরে এই নারকীয় তাণ্ডব চলতে থাকে। ভয় ও আতঙ্কে অন্যান্য পর্যটকেরাও তখন দিশেহারা হয়ে আত্মরক্ষার খাতিরে ছোটাছুটি শুরু করেন।
পুলিশি তৎপরতা ও মামলা রুজু
ঘটনার পর হেভেলি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। পুনে গ্রামীণ পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট সন্দীপ সিং গিল জানিয়েছেন, পোশাক সংক্রান্ত বচসাকে কেন্দ্র করে এক ব্যক্তির ওপর শারীরিক আক্রমণ চালানো হয়। পুলিশ অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং অপরাধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ৯ জনের নাম উল্লেখ করে একটি ফৌজদারি মামলা রুজু করেছে। এ বিষয়ে আরও গভীরে গিয়ে তদন্ত চালানো হচ্ছে এবং অভিযুক্তরা যাতে কঠোরতম শাস্তি পায় তা সুনিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ।
স্বঘোষিত ‘নীতি পুলিশদের’ দৌরাত্ম্যে প্রশ্নচিহ্ন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুনে ও তার আশপাশের ঐতিহাসিক দুর্গগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ইতিহাস সংরক্ষণের নামে বেশ কিছু স্বঘোষিত ক্লাবের বাড়বাড়ন্ত দেখা গেছে। প্রথমদিকে প্রশংসনীয় ভূমিকা নিলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গোষ্ঠীগুলোর একাংশ নিজেদের হাতেই আইন তুলে নেওয়ার বিপজ্জনক প্রবণতা দেখাচ্ছে। পর্যটকদের কী পরা উচিত, তারা কীভাবে হাঁটাচলা করবে— এসব নির্ধারণে একের পর এক ফতোয়া জারি করতে শুরু করেছে তারা। ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এভাবে আতঙ্কের রূপ নেওয়া এবং জনসমক্ষে একরত্তি শিশুর পোশাকের অজুহাতে তাণ্ডব চালানোর ঘটনায় মহারাষ্ট্রের প্রশাসন ও পর্যটন ব্যবস্থার ওপর চরম প্রশ্ন চিহ্ন উঠে গেল।
