বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

ভোররাতে তারাপীঠের হোটেলে আগুন, মৃতের সংখ্যা ৭, গ্রেপ্তার হোটেল মালিক

17 August, 2026 11:18 AM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

তারাপীঠ : তারাপীঠের বুকে নেমে এল এক গভীর অমানিশা। উৎসবের আনন্দ বা পুণ্যলাভের আশা নিমেষেই ধূলিস্যাৎ হয়ে গেল লেলিহান শিখার গ্রাসে। পুড়ে ছাই হয়ে গেল একটি হোটেল, আর সেই সঙ্গে নিভে গেল একাধিক তাজা প্রাণ। মৃতের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলায় গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার পরই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। গাফিলতির অভিযোগে পুলিশ ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করেছে হোটেলমালিককে। কিন্তু কোটি কোটি টাকার হোটেল ব্যবসায় সুরক্ষার ন্যূনতম নিয়মগুলো কেন শিকেয় তুলে রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল।

প্রাথমিক তদন্তে যা তথ্য সামনে আসছে, তাতে শিউরে উঠতে হয়। চোখের পলকে কীভাবে একটি বিলাসবহুল বা সাধারণ আবাসিক হোটেল মানুষের কাছে জীবন্ত কবরস্থান বা মরণফাঁদে পরিণত হতে পারে, তারাপীঠের এই মর্মান্তিক ঘটনা তার এক জ্বলন্ত দলিল। প্রত্যক্ষদর্শী ও আবাসিকদের অনেকেরই বিস্ফোরক অভিযোগ, আগুন লাগার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তাঁরা হুড়োহুড়ি করে বেরোনোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বিপদের দিনে তাঁদের বাঁচানোর রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। হোটেলের পিছনের দিকের জরুরি নির্গমনের দরজাটি তালাবন্ধ অবস্থায় ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিকে পেরেছেন ছুটছেন, কিন্তু ফাঁদ হয়ে ওঠা ওই হোটেল থেকে বেরোনোর কোনো উপায় ছিল না। চারদিক থেকে ধোঁয়া আর আগুনে আটকে পড়ে ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন অসহায় আবাসিকরা।

মহাভারত বা পৌরাণিক উপকথার সেই জতুগৃহের কথা আজও মানুষের মনে ত্রাস সৃষ্টি করে, যেখানে শত্রুকে পুড়িয়ে মারার জন্য চক্রান্ত করা হয়েছিল। আর একবিংশ শতকের এই আধুনিক যুগে এসে যদি সামান্য লাভের লোভে বা গাফিলতিতে হোটেলগুলোকে এমন জতুগৃহ বানিয়ে ফেলা হয়, তবে তার চেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না। তারাপীঠের ওই অভিশপ্ত হোটেলের অন্দরে ঠিক কী ধরনের অব্যবস্থা ছিল, তা এখন এক একটি করে খতিয়ে দেখছে পুলিশ ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। হোটেলের ফায়ার সেফটি বা অগ্নিনির্বাপণ লাইসেন্স আদৌ বৈধ ছিল কি না, কিংবা মাঝেমধ্যে সেগুলির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হতো কি না, তা নিয়ে জোরদার তদন্ত শুরু হয়েছে। ফায়ার এক্সটিংগুইশার ঠিকমতো কাজ করছিল কি না বা স্মোক ডিটেক্টর ছিল কি না, তা নিয়ে ধন্দ কাটছে না।

পুণ্যার্থীদের ভিড়ে ঠাসা তারাপীঠে হোটেল ব্যবসা এখন রমরমিয়ে চলছে। দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ আসেন মা তারার পুজো দিতে। কিন্তু সেই ভক্তদের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়? প্রশাসন সূত্রে খবর, বহুতল এই হোটেলগুলোতে অনেক সময় অনুমোদিত নকশা ভেঙে অতিরিক্ত ঘর তৈরি করা হয়। ভেন্টিলেশন বা পর্যাপ্ত বাতাসের বন্দোবস্ত না থাকায় শর্টসার্কিট হলে মুহূর্তের মধ্যে বিষাক্ত ধোঁয়া পুরো বিল্ডিংয়ে ছড়িয়ে পড়ে। আর তার ওপর যদি জরুরি গেট বন্ধ রাখার মতো অপরাধমূলক উদাসীনতা থাকে, তবে মানুষের আর বেঁচে ফেরার কোনো সুযোগ থাকে না। এই ঘটনায় হোটেলমালিককে গ্রেফতার করা হলেও শুধু কি একজন ব্যক্তির শাস্তিই সবকিছুর সমাধান? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে থাকা গোটা সিস্টেমের ফাঁকফোকর ও ঘুষের সংস্কৃতিকে উপড়ে ফেলা দরকার, সেই প্রশ্নও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

আজকের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আমাদের সামনে এক ভয়ঙ্কর আয়না ধরে দিয়েছে। লোভের আগুনে মানুষের জীবনকে বাজি রেখে এভাবেই কি তিল তিল করে গড়ে উঠবে মৃত্যুর সওদাগরখানা? কতগুলো প্রাণ ঝরে গেলে, কতগুলো পরিবার এভাবে পথে বসলে হুঁশ ফিরবে হোটেল মালিকদের? তারাপীঠের এই অভিশপ্ত হোটেলের ছাইচাপা আগুন থেকে আজ শুধু শোকের ধোঁয়া উঠছে না, বরং বাংলাজুড়ে সমস্ত পর্যটন কেন্দ্র ও হোটেলের নিরাপত্তা নিয়ে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee