বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
রবীন্দ্র সরোবরে সাঁতার শিখতে গিয়ে মৃত্য়ু শিক্ষার্থীর ফারাক্কায় দ্রুত গতিতে চলছে লাইন মেরামতির কাজ মালদা মেডিকেলে শিশুমৃত্য়ুর জের, সাসপেন্ড সুপার এবার রাজ্য়ের মডেল স্কুল প্রকল্পে সিএম শ্রী ইন্সটিউট, ঘোষণা মুখ্য়মন্ত্রীর

আশিসের রহস্যমৃত্যুতে তপ্ত রাজ্য রাজনীতি!

16 August, 2026 3:29 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

কলকাতা/রামপুরহাট: রাজনীতি বড়োই নিষ্ঠুর!

যে মানুষটা ২০০১ সাল থেকে টানা পঁচিশ বছর রামপুরহাটের মানুষের সুখ-দুঃখের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী ছিলেন, যিনি ছিলেন টানা পাঁচবারের বিধায়ক এবং রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার, রবিবার সকালে সেই আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের ঘটনায় আক্ষরিক অর্থেই তোলপাড় বঙ্গ রাজনীতি।

বাড়ি সংলগ্ন দলীয় কার্যালয় থেকে উদ্ধার হওয়া একটি সুইসাইড নোটে তিনি রাজনীতিতে আসার জন্যই চরম আক্ষেপ প্রকাশ করে গিয়েছেন। কিন্তু রামপুরহাট কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক, আপাদমস্তক ‘সজ্জন’ ও মার্জিত এক রাজনীতিকের এমন মর্মান্তিক পরিণতি কি নিছকই আত্মহত্যা, নাকি এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে গভীর কোনও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই এখন রাজনৈতিক তরজায় ফুটছে গোটা রাজ্য। আশিসবাবুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে শুরু হয়েছে তুমুল রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং কুণাল ঘোষ— হেভিওয়েট নেতাদের মন্তব্য ঘিরে ক্রমশ পারদ চড়ছে রাজ্য রাজনীতির।

‘১৫ বছরের দুর্নীতির অভিশাপ…’

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক মৃত্যুতে সবথেকে বড় রাজনৈতিক বোমাটি ফাটিয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এই মৃত্যুর দায় সরাসরি ‘কালীঘাট’ অর্থাৎ শীর্ষ নেতৃত্বের দিকেই ঠেলে দিয়েছেন তিনি। অত্যন্ত কড়া ভাষায় তোপ দেগে ঋতব্রতর বিস্ফোরক মন্তব্য, “এটা নিছক কোনও মৃত্যু নয়, এটা গত ১৫ বছরের দুর্নীতির অভিশাপ।” তাঁর মতে, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একজন সৎ এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মানুষকে দিনের পর দিন কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা হয়েছে। দলের ভেতরের একাংশের প্রবল চাপ এবং দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে আপস না করতে পারার কারণেই তাঁকে এই চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ করেছেন ঋতব্রত। তাঁর এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক শিবিরের অন্দরের চাপানউতোর এক লহমায় অনেকটা বেড়ে গিয়েছে।

আত্মঘাতীই কি আশিস? নিশ্চিত নন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা!

এদিকে, এই মৃত্যুকে ঘিরে ঘনীভূত হয়েছে আরও এক পরত রহস্য। প্রাক্তন মন্ত্রী আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় কি আদৌ আত্মঘাতী হয়েছেন? এই বিষয়ে রীতিমতো সন্দেহ প্রকাশ করেছেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, “আশিসবাবুর মতো একজন শিক্ষিত, মার্জিত এবং দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া রাজনীতিক হঠাৎ করে আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নেবেন, এটা মেনে নেওয়া খুব কঠিন। এই ঘটনার পিছনে অন্য কোনও কারণ নেই তো? তাঁকে খুন করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়নি, তার নিশ্চয়তা কোথায়?” অগ্নিমিত্রার এই মন্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই এই মৃত্যুর তদন্তের মোড় কোন দিকে ঘোরে, সেদিকে কড়া নজর রাখছে ওয়াকিবহাল মহল।

‘আত্মহত্যা হলেও তা প্ররোচনার ফল’, পালটা তোপ কুণালের

অগ্নিমিত্রা পাল এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন জোরালো আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে পালটা তোপ দেগেছেন কুণাল ঘোষ। তাঁর মতে, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একজন সম্মানীয় মানুষকে পরিকল্পিতভাবে মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কুণাল ঘোষ স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেন, “যদি ধরেও নেওয়া হয় যে তিনি আত্মহত্যা করেছেন, তবুও বুঝতে হবে এটা প্ররোচনার ফল।” কুণাল বোঝাতে চেয়েছেন, বিরোধী দল বা রাজনৈতিক মহলের একাংশের ক্রমাগত কুৎসা, মিথ্যা অভিযোগ এবং তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টার ফলেই আশিসবাবু মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যাঁরা তাঁকে দিনের পর দিন অপমান করে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করেছেন, তাঁদেরই এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করা উচিত বলে মনে করেন কুণাল।

কী বললেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়?

এই চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝেই সোশ্যাল মিডিয়ায় মুখ খুলেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একজন প্রবীণ রাজনীতিকের মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন তিনি। অভিষেক তাঁর পোস্টে লেখেন, রাজনীতি এবং সাংবাদিকতার একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকা উচিত। আশিসবাবুর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কথা স্মরণ করে অভিষেক বুঝিয়ে দেন, এইভাবে একজন বর্ষীয়ান নেতার চলে যাওয়া অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং তা এক অপূরণীয় ক্ষতি। অভিষেক তাঁর বার্তায় প্রচ্ছন্নভাবে এই মৃত্যু নিয়ে অহেতুক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি এবং নোংরা রাজনীতি না করারই বার্তা দিয়েছেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

সুইসাইড নোটে লুকিয়ে আসল রহস্য?

উদ্ধার হওয়া সুইসাইড নোটে তারাপীঠ রামপুরহাট উন্নয়ন পর্ষদ (TRDA)-এর আর্থিক দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন আশিসবাবু। চিঠিতে তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন যে, কারও চাকরি করে দেওয়ার নাম করে তিনি কখনও এক টাকাও নেননি এবং টিআরডিএ-র কোনও টেন্ডার বা চেক ইস্যু করার ক্ষেত্রে তাঁর কোনও ভূমিকা ছিল না। তাঁকে শুধু কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা হয়েছে। এই চিঠির বয়ান, ঋতব্রতর ‘দুর্নীতির অভিশাপ’ তত্ত্ব, অগ্নিমিত্রার খুনের সন্দেহ, কুণালের ‘প্ররোচনা’র অভিযোগ এবং অভিষেকের শোকবার্তার পর এই রহস্যের জল কতদূর গড়ায়, এখন সেটাই দেখার। ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

 

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee