তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীক ফ্রিজ করল কমিশন, উপনির্বাচনে নেই ঘাসফুল
সংবাদদাতা, কলকাতা: তৃণমূল কংগ্রেসের পরিচিত ‘জোড়াফুল’ প্রতীক আপাতত কারও হাতেই রইল না। প্রায় তিন দশক আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে যে প্রতীক গড়ে তুলেছিলেন, দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের জেরে তা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। দীর্ঘ টানাপড়েনের পর নির্বাচন কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, দলের প্রকৃত মালিকানা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রতীকটি ব্যবহারের অনুমতি কাউকে দেওয়া হবে না।
আগামী ৬ অক্টোবর রাজ্যের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর কেন্দ্রে বিধানসভার উপনির্বাচন। কিন্তু মমতা-শিবির ও বিক্ষুব্ধ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী—উভয়কেই এখন আলাদা নাম ও আলাদা প্রতীক বেছে নিতে হবে কমিশনের সংরক্ষিত তালিকা থেকে। এমনকি ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটিও তারা আপাতত ব্যবহার করতে পারবে না, যদিও নতুন নামের সঙ্গে পুরনো নামের সম্পর্কের উল্লেখ রাখার সুযোগ থাকছে। কমিশন স্পষ্ট করেছে, এটি একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা মাত্র—দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চূড়ান্ত রায় পরে জানানো হবে।
এই সংকট তৈরি হয়েছে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর। মমতা শুধু সরকার থেকেই সরে যাননি, তাঁর গড়া দলও ভাঙনের মুখে পড়েছে। মমতার পছন্দের বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে সরিয়ে বিদ্রোহীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ঋতব্রতকে সেই আসনে বসিয়েছেন, পাশাপাশি প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ রায়ের নেতৃত্বে গঠন করেছেন নতুন জাতীয় কর্মসমিতি। উল্লেখযোগ্য বিষয়, মমতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যও এখন ঋতব্রত-শিবিরের পক্ষে।
জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন কমিশন একাধিকবার দুই পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছে এই বিরোধ মেটাতে। দিল্লির নির্বাচন সদনে ডেকে পাঠানো হয়েছিল দুই শিবিরকেই, যেখানে ঋতব্রত-শিবির প্রতীক পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গেল ভিন্ন পথে। উপনির্বাচনের প্রার্থী তালিকাও ইতিমধ্যে চূড়ান্ত—নন্দীগ্রামে মমতা-শিবিরের সঞ্চিতা প্রধান দে-র বিপরীতে লড়বেন ঋতব্রত-শিবিরের মহম্মদ এহেতাশ মুল হক, আর রেজিনগরে মুখোমুখি রবিউল আলম চৌধুরী ও শেখ সফিউদ্দিন জামান।
কমিশনের এই সিদ্ধান্তে দুই শিবিরের প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন মেরুর। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই নির্দেশকে আইনি দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন, তাঁরা এটি মেনে নেবেন না এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। বিদ্রোহী শিবিরকে খোঁচা দিয়ে তিনি বলেছেন, যেহেতু কেউই প্রতীক বা নাম পায়নি, তাই একচেটিয়া দাবিদারদের হাতেও কার্যত কিছু রইল না—যদিও নতুন পরিচিতি তৈরি করাটা যে চ্যালেঞ্জের, তা তিনি স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে ঋতব্রত-শিবিরের বিধায়ক আখরুজ্জামান কমিশনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, সময়ের চাপেই এই তড়িঘড়ি ব্যবস্থা, কিন্তু আইনি লড়াই শেষে জোড়াফুল প্রতীক তাদের হাতেই থাকবে বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
সব মিলিয়ে, ২৮ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে কোনো ভোট হতে চলেছে জোড়াফুল প্রতীক ছাড়াই—আর দলের প্রকৃত মালিকানা নিয়ে লড়াই যে সহজে থামছে না, তা দুই পক্ষের প্রতিক্রিয়াতেই স্পষ্ট।
