বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
রবীন্দ্র সরোবরে সাঁতার শিখতে গিয়ে মৃত্য়ু শিক্ষার্থীর ফারাক্কায় দ্রুত গতিতে চলছে লাইন মেরামতির কাজ মালদা মেডিকেলে শিশুমৃত্য়ুর জের, সাসপেন্ড সুপার এবার রাজ্য়ের মডেল স্কুল প্রকল্পে সিএম শ্রী ইন্সটিউট, ঘোষণা মুখ্য়মন্ত্রীর

‌কাঁটাতারে বাঁধা স্বাধীনতা: ঋত্বিকের সিনেমায় যে দেশ আজও ঘরে ফেরেনি

15 August, 2026 12:16 PM admin
শেয়ার করুন

অর্ক : ১৫ আগস্ট মানেই লালকেল্লার তোপধ্বনি, পতাকার ওড়াউড়ি আর উৎসবের আলোর রোশনাই। কিন্তু ইতিহাস যখন উৎসবের মেজাজে মেতে ওঠে, সেলুলয়েডের ফিতেয় তখন নিঃশব্দে জমা হয় কিছু কান্না। বাংলা সিনেমার পর্দায় স্বাধীনতার ছবিটা চিরকালই কিছুটা ধূসর, কিছুটা বিষণ্ণ। সেখানে প্ল্যাটফর্মের ধোঁয়া, উদ্বাস্তু কলোনির ভিড় আর শিকড় ছেঁড়ার যন্ত্রণাই শেষ কথা বলে। আর সেই বিষণ্ণতার সমান্তরালে যিনি নিজের বুকের রক্ত দিয়ে ছবি এঁকে গেছেন, তিনি—ঋত্বিক কুমার ঘটক।
সত্যজিৎ রায়ের সূক্ষ্ম নাগরিক মানবিকতা কিংবা মৃণাল সেনের তীব্র রাজনৈতিক প্রতিরোধ—বাংলা সিনেমায় স্বাধীনতার নানা রূপ দেখা গেছে সত্যি। কিন্তু দেশভাগের ক্ষতকে সরাসরি নিজের বুকে ধারণ করে, স্বাধীনতার ছদ্মবেশকে ছিঁড়ে ফেলে যে মানুষটি স্বাধীনতার অসারতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন, তিনি কেবলই ঋত্বিক। ১৫ অগস্টের উৎসবের উল্লাসে যখন লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল মানুষের কান্না চাপা পড়ে যায়, তখন সেই নিঃশব্দ আর্তনাদকে কান পেতে শোনার জন্য ঋত্বিকের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া আমাদের আর গতি কী?
তাঁর সিনেমায় দেশভাগ কোনো অতীত ঘটনা নয়, এক জীবন্ত ক্ষত। স্বাধীনতা পাওয়ার পরপরই নাগরিক (১৯৫৩) ছবিতে তিনি দেখিয়েছিলেন এক মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ আর বাস্তুচ্যুত হয়ে কলোনির অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার গল্প।
এরপর আসে তাঁর তথাকথিত ‘দেশভাগ ত্রয়ী’—মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার এবং সুবর্ণরেখা। ১৯৪৭-এর পর পূর্ববঙ্গ থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া কোটি কোটি মানুষের ঘর হারানোর যন্ত্রণাকে ঋত্বিক কোনো রাজনৈতিক দলের চশমায় দেখেননি; দেখেছেন মানবতার চরম বিপর্যয় হিসেবে।
মেঘে ঢাকা তারা-র নীতা কোনও রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেয় না। কিন্তু ক্ষয়িষ্ণু সংসারের বোঝা টানতে টানতে পাহাড়ের কোলে তার শেষ আকুল আর্তনাদ—
‘‌দাদা, আমি যে বাঁচতে চেয়েছিলাম!’‌
—এই একটি সংলাপ প্রথাগত স্বাধীনতার অসারতাকেই প্রশ্নে বিদ্ধ করে। রাষ্ট্র স্বাধীন হল, কিন্তু নীতার মতো লক্ষ লক্ষ মানুষের নিজস্ব স্বাধীনতা কোথায় হারিয়ে গেল?
ঋত্বিকের কাছে মানচিত্রের কাঁটাতার কেবল ভূগোলের সীমানা ছিল না, তা ছিল প্রতিটি শরণার্থীর সংসারের ভেতরে ঘটে যাওয়া এক অদৃশ্য ভূমিকম্প। সুবর্ণরেখার ‘নবজীবন কলোনি’ নামটি তাই শুধু একটা ঠিকানা নয়, চরম এক ব্যঙ্গ। নতুন জীবনের প্রলোভন দেখালেও ছবিটির প্রতিটি চরিত্র বারবার ফিরে যেতে চায় তাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশবে, পুরনো উঠোনে। সেখানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের পরিচিত সুর—‘‌আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়’‌—হয়ে ওঠে হারানো ভূখণ্ডের এক অলীক স্বপ্ন।
আবার ‘‌কোমল গান্ধার’‌–এ ঋত্বিক তুলে ধরেন সংস্কৃতির অখণ্ডতাকে। ছবির এক অবিস্মরণীয় দৃশ্যে দেখা যায়, ট্রেন লাইনটি হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে বাঁশের ব্যারিকেডে—ওপারেই পড়ে আছে ফেলে আসা বাংলাদেশ। কিন্তু সেই কাঁটাতারের ওপার থেকে ভেসে আসা মুসলিম মাঝির ভাটিয়ালি আর এপারের হিন্দু বিয়ের গানকে পাশাপাশি বসিয়ে ঋত্বিক যেন মনে করিয়ে দেন—সীমান্ত দিয়ে জমি ভাগ করা যায়, কিন্তু নদী আর সুরের কোনও ভৌগোলিক বিভাজন হয় না।
স্বাধীনতার আড়াই দশক পর, স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে ঋত্বিক যখন ‘‌তিতাস একটি নদীর নাম’‌ (১৯৭৩) তৈরি করলেন, সেখানেও সেই একই ক্ষত। তিতাস সেখানে কেবল একটি নদী নয়, সে যেন খণ্ডিত বাংলার শুকিয়ে যাওয়া প্রাণভোমরা। মালো সম্প্রদায়ের বিলুপ্তির মধ্যে দিয়ে তিনি এক গোটা সংস্কৃতির মৃত্যুর শোকগাথা গাইলেন। শুকিয়ে যাওয়া নদীর বুকে তৃষ্ণার্ত বাসন্তীর সেই হাহাকার আর জল খোঁজার দৃশ্য যেন দেশভাগের পর শুকিয়ে যাওয়া বাংলার শেকড়েরই আর্তনাদ। নদী শুকিয়ে গেলে যেমন কৃষ্টির মৃত্যু হয়, দেশ ভাগ হলেও ঠিক তেমনই অখণ্ড বাংলার আত্মা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়।
এরপর যখন তিনি তাঁর শেষ ছবি ‘‌যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’‌–য় গিয়ে পৌঁছান, তখন তিনি নিজেই নিজেকে উজাড় করে দেওয়া পথভ্রষ্ট ‘নীলকণ্ঠ’। দেশভাগের ধাক্কা পার হয়ে সত্তরের দশকের নকশালবাড়ি আন্দোলন ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি আমাদের চাবুক মেরে যেন প্রশ্ন তোলেন—
‘‌ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো!’‌
এই কি তবে সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা? কার জন্য এই স্বাধীনতা?
নিজের ‘‌Cinema and I’‌ বইতে ঋত্বিক লিখেছিলেন, সিনেমা তাঁর কাছে কোনও বিনোদন নয়, মানুষের দুঃখ, ক্ষোভ আর আর্তনাদ প্রকাশের একটি অস্ত্র। আর ‘‌Rows and Rows of Fences’‌-এ তিনি সরাসরি তোপ দেগেছিলেন সেই তথাকথিত স্বাধীনতার ওপর, যা মানুষকে নিজের ভিটে থেকে উচ্ছেদ করে চিরকালের জন্য পরবাসী বানিয়ে দেয়।
প্রতি বছর ১৫ অগস্টে যখন রাষ্ট্র তার উৎসব উদযাপন করে, ঋত্বিকের সিনেমা তখন এক অস্বস্তিকর স্তব্ধতা তৈরি করে। তিনি আমাদের জাতীয় পতাকার মর্যাদাকে অস্বীকার করতে বলেন না; বরং পতাকার ছায়ায় দাঁড়িয়ে একবার পেছন ফিরে তাকাতে বলেন—দেখে নিতে বলেন, কত কোটি মানুষের স্বপ্নের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে আজকের এই ভৌগোলিক ভিত্তিপ্রস্তর।
দেশ স্বাধীন হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু সবার ঘর কি স্বাধীন হয়েছিল?
কেউ কেউ হয়তো আজও দূরগামী ট্রেনের জানলায় মুখ রেখে খুঁজে চলেন সেই হারানো সীমানা। ওপারে পড়ে থাকা নদী, বনতুলসীর ঝোপ আর এক চিলতে ভাঙা বারান্দা…
যার নাম ছিল—অখণ্ড বাংলা।

প্রতিবেদন

admin