Razaullah Mashwani: হোয়াইটওয়াশের মুখে পাকিস্তানের একমাত্র আলো রজাউল্লাহ, ইমরানের দেশে নতুন তারার খোঁজ
বার্মিংহাম: পাকিস্তানের ক্রিকেটে এই মুহূর্তে আলো খুঁজতে গেলে বড় নামগুলোর দিকে তাকিয়ে লাভ নেই। বাবর আজম, শাহিন আফ্রিদি, নাসিম শাহ—নাম যত বড়, হতাশা তত বেশি। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পরপর দু’টি টেস্ট হারের পর তৃতীয় ম্যাচেও যখন সবকিছু ফের ভেঙে পড়ার মুখে, তখন সেই অন্ধকারেই হঠাৎ আলো জ্বাললেন এমন এক তরুণ, যাঁর নামও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বেশির ভাগ মানুষের কাছে নতুন— রজাউল্লাহ (Razaullah)।

পুরোনো স্মৃতি ফেরালেন রজাউল্লাহ
বয়স ২১। মর্দানের এই ডানহাতি পেসারের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলতে এই টেস্টের আগে শূন্য। মাত্র আটটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলে ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট অভিষেক। অথচ প্রথম বল থেকেই তাঁর মধ্যে একটা জিনিস চোখে পড়েছে—ভয় নেই। গতি আছে, বাউন্স আছে, আর আছে নিজের মতো করে আক্রমণ করার সাহস। পাকিস্তান যে গতির জন্য একসময় গোটা ক্রিকেটবিশ্বকে ভয় দেখাত, রজাউল্লাহ যেন তারই পুরনো স্মৃতিটা ফিরে এসেছে।
অভিষেকের প্রথম ইনিংসেই সামনে জো রুট। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম উইকেট হিসেবে এর চেয়ে বড় নাম আর কী-ই বা হতে পারে! প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার গতির কাছাকাছি বল ছুড়ে রুটকে চাপে ফেললেন রজাউল্লাহ। শেষ পর্যন্ত এলবিডব্লিউ। প্রথম ইনিংসে তাঁর শিকার চার। কিন্তু বল হাতে সেই চার উইকেটও শেষ পর্যন্ত তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে থাকল না। আসল গল্পটা তখনও বাকি।
আরও পড়ুন: Women’s Asia Cup: শেফালির ঝড়ে ফাইনালে ভারত, কিন্তু ব্যাটিং চিন্তা রয়েই গেল
পাকিস্তান ব্যাট করতে নেমে যখন সাত উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে, তখন ন’নম্বরে নামলেন রজাউল্লাহ। এমন পরিস্থিতিতে একজন পেসারের কাছে প্রত্যাশা থাকে কয়েকটা বল টিকে থাকা। রজাউল্লাহর পরিকল্পনাটা যেন অন্য ছিল। ব্যাট উঠল, বল গ্যালারিতে গেল। একবার, দু’বার, তিনবার… শেষ পর্যন্ত নয়টি ছক্কা! ৮১ রানের ইনিংস। মাত্র ৪৩ বলে পঞ্চাশ। টেস্ট অভিষেকে পাকিস্তানের হয়ে দ্রুততম অর্ধশতরানের নজিরও গড়ে ফেললেন। মোহাম্মদ আব্বাসকে সঙ্গে নিয়ে নবম উইকেটে ১২১ রান যোগ করে ইংল্যান্ডের যাবতীয় হিসাব ওলটপালট করে দিলেন।
ইনিংসটা শুধু মারকাটারি ছিল না, ছিল অদ্ভুত নির্ভার। অভিষেক টেস্ট, ইংল্যান্ডের মাটিতে, দল বিপদে—কোনও কিছুই যেন মাথায় রাখেননি রজাউল্লাহ। এমন আগ্রাসী ব্যাটিং করতে গিয়ে তাঁর তিনটি ব্যাটের দু’টিও ভেঙে যায়। ইংল্যান্ডের অন্তর্বর্তী কোচ মার্কাস ট্রেসকোথিক পরে এই ঝড়কে বলেছেন ‘পারফেক্ট স্টর্ম’। নামটার সঙ্গে রজাউল্লাহর সেই ইনিংসের মিলও কম নয়।
তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে—পাকিস্তান কি নতুন তারা পেয়ে গেল?
প্রশ্নটা উঠবে। কারণ পাকিস্তান এমন প্রতিভা আগেও পেয়েছে। শাহিন আফ্রিদি, নাসিম শাহদের মতো তরুণ পেসাররাও একসময় এইভাবেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের জানান দিয়েছিলেন। কিন্তু রজাউল্লাহকে এখনই কারও সঙ্গে তুলনা করার সময় নয়। বরং তাঁর গল্পের আকর্ষণটা অন্য জায়গায়।
কয়েক মাস আগেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে থাকা এক তরুণ। টেস্ট দলে ডাক পাওয়ার সময় তাঁর পাসপোর্ট পর্যন্ত তৈরি ছিল না বলে জানা যায়। আর কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ছেলেই জো রুটকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, চার উইকেট নিয়েছেন, ব্যাট হাতে ৮১ করেছেন এবং ইংল্যান্ডের মাটিতে পাকিস্তানের ভাঙা লেজকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।
পাকিস্তানের ক্রিকেট যখন পরিচিত নামগুলোর ব্যর্থতায় বারবার প্রশ্নের মুখে, তখন রজাউল্লাহর আবির্ভাব তাই নিছক একটি ভাল অভিষেক নয়। এটা ভবিষ্যতের একটা দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ। অবশ্যই এক ইনিংসে তারকা তৈরি হয় না। একটা টেস্টেও নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আসল পরীক্ষা হবে এই ঝলককে কতটা ধারাবাহিকতায় বদলাতে পারেন রজাউল্লাহ।
তবু আপাতত পাকিস্তান একটু স্বস্তি পেতেই পারে। হোয়াইটওয়াশের মুখে দাঁড়িয়েও তাদের ক্রিকেটে অন্তত একজনকে দেখে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর কারণ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান হয়তো নতুন শোয়েব পায়নি, নতুন শাহিনও নয়। আপাতত তারা পেয়েছে রজাউল্লাহকেই। আর অন্ধকারের মধ্যে কখনও কখনও নিজের নামেই আলো জ্বালতে হয়।
ম্যাচের আপডেট: তৃতীয় টেস্টে প্রথম ইনিংসে পাকিস্তান ১৩৩ রানে গুটিয়ে যাওয়ার পর ইংল্যান্ড ৪৫৩ রান করে ৩২০ রানের লিড নেয়। দ্বিতীয় ইনিংসে শান মাসুদের ৯৫, বাবর আজমের ৭৬ এবং আজান আওয়াইসের ৫৯ রানের পর রজাউল্লাহ-আব্বাসের ১২১ রানের জুটি পাকিস্তানকে ৪৪৯-এ পৌঁছে দেয়। ইংল্যান্ডের সামনে জয়ের লক্ষ্য ১৩০ রান। সিরিজের শেষ টেস্টের ফল তখনও বাকি, কিন্তু পাকিস্তান যে এই ম্যাচ থেকে একটি নতুন নাম নিয়ে বেরোতে চলেছে, সেটাই এখন কিছুটা স্বস্তি।
